শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই কেন দেখা মেলে ক্যাঙ্গারু ও কোয়ালার মতো প্রাণীর?

প্রকাশঃ অক্টোবর ২২, ২০২৬ সময়ঃ ৭:৪১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৭:৪১ অপরাহ্ণ

কোয়ালা, ক্যাঙ্গারু কিংবা ওমব্যাটের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অস্ট্রেলিয়ার ছবি। থলিধারী এসব স্তন্যপায়ী প্রাণী দেশটির বন্যপ্রাণীর অন্যতম পরিচয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাদের পূর্বপুরুষদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বর্তমান অস্ট্রেলিয়ায় নয়, বরং পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে। দীর্ঘ বিবর্তন, মহাদেশের স্থানান্তর এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একসময় অস্ট্রেলিয়া হয়ে ওঠে এসব প্রাণীর প্রধান আবাসস্থল।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, থলিধারী প্রাণীদের ইতিহাস কোটি কোটি বছরের পুরোনো। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে তাদের বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন স্থলসংযোগ তাদের বিস্তারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

থলিধারী প্রাণী অন্য স্তন্যপায়ীদের থেকে আলাদা কেন?

মার্সুপিয়াল বা থলিধারী প্রাণীরা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি বিশেষ গোষ্ঠী। এদের অধিকাংশ প্রজাতির শাবক জন্মের সময় অত্যন্ত অপরিণত থাকে। জন্মের পর শাবক মায়ের শরীর বেয়ে স্তনের কাছে পৌঁছায় এবং সেখানে দুধ পান করতে করতে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে মায়ের পেটের থলি শাবককে নিরাপদে বড় হতে সাহায্য করে।

ক্যাঙ্গারু ও কোয়ালার মতো প্রাণীর ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। তবে সব মার্সুপিয়ালের সুস্পষ্ট বাহ্যিক থলি থাকে না। কিছু প্রজাতির শাবক মায়ের শরীরের সঙ্গে লেগে থেকে কিংবা অন্যভাবে সুরক্ষিত অবস্থায় বেড়ে ওঠে।

ব্রিটেনের সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী রবিন বেকের গবেষণায় উঠে এসেছে, এই প্রাণীদের বিবর্তনের ইতিহাস অস্ট্রেলিয়ায় তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বহু আগের। জীবাশ্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা পেয়েছেন, প্রাচীন মার্সুপিয়াল ও তাদের নিকটাত্মীয়রা বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রাচীন পূর্বপুরুষদের সন্ধান মিলেছে এশিয়ায়

থলিধারী প্রাণীদের বিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে জীবাশ্ম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে। চীনে প্রায় ১২ কোটি বছর আগের কিছু প্রাচীন স্তন্যপায়ী প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যেগুলো মার্সুপিয়ালদের বিবর্তনীয় ইতিহাস অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব জীবাশ্মকে বর্তমানের সব থলিধারী প্রাণীর সরাসরি পূর্বপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

প্রাচীন পৃথিবীতে আজকের মতো মহাদেশগুলোর অবস্থান ছিল না। উত্তর গোলার্ধের লরেশিয়া নামের বিশাল ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বড় অংশ। সেই সময় বিভিন্ন ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী এসব অঞ্চলে বিবর্তিত ও বিস্তৃত হয়েছিল।

জীবাশ্মের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রাচীন মার্সুপিয়ালদের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বহু বৈচিত্র্য ছিল। তাদের অনেক প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্ত। সময়ের সঙ্গে জলবায়ু, খাদ্যের প্রাপ্যতা ও পরিবেশ বদলে যাওয়ায় কিছু গোষ্ঠী টিকে ছিল, আবার কিছু গোষ্ঠী হারিয়ে গেছে।

দক্ষিণ আমেরিকায় বিস্তারের নতুন অধ্যায়

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বড় ধরনের জীববৈচিত্র্যগত পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ের কাছাকাছি গ্রহাণুর আঘাতসহ বিভিন্ন পরিবেশগত বিপর্যয়ে অ-পাখি ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর পরবর্তী সময়ে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিস্তার ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।

দক্ষিণ আমেরিকায় মার্সুপিয়াল ও তাদের নিকটাত্মীয়দের বিকাশ ঘটে। দীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় তারা বিভিন্ন ধরনের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। কিছু প্রজাতি পোকামাকড় খেতে অভ্যস্ত হয়, কিছু ফল ও বীজের ওপর নির্ভর করে, আবার কিছু প্রজাতি মাংসাশী জীবনধারাও গ্রহণ করে।

এই বৈচিত্র্য দেখায়, একই বিবর্তনীয় গোষ্ঠীর প্রাণীরা পরিবেশ ও খাদ্যের ধরন অনুযায়ী কত ভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ায় যেসব পরিবেশে প্লাসেন্টাল স্তন্যপায়ীরা বিস্তার লাভ করেছিল, দক্ষিণ আমেরিকায় মার্সুপিয়ালদের কিছু গোষ্ঠীও তুলনামূলকভাবে ভিন্নভাবে বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নেয়।

দক্ষিণ আমেরিকায় এখনো রয়েছে বহু প্রজাতি

অস্ট্রেলিয়া থলিধারী প্রাণীদের জন্য সবচেয়ে পরিচিত অঞ্চল হলেও দক্ষিণ আমেরিকাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির অপোসাম, শ্রু-অপোসাম এবং মনিটো দেল মন্টের মতো প্রাণী বাস করে।

অপোসামদের মধ্যে ভার্জিনিয়া অপোসাম বিশেষভাবে পরিচিত। এটি উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী একমাত্র স্থানীয় মার্সুপিয়াল প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকায় প্রাণীদের বিস্তারের ইতিহাসে এই প্রজাতির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

এখানে ‘অপোসাম’ ও ‘পসাম’ শব্দ দুটির পার্থক্য বোঝা জরুরি। অপোসাম বলতে সাধারণত আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন থলিধারী প্রাণীকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে পসাম বলতে সাধারণত অস্ট্রেলিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী কয়েকটি ভিন্ন মার্সুপিয়াল গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। নামের মিল থাকলেও তাদের বিস্তার ও বিবর্তনীয় ইতিহাস এক নয়।

অ্যান্টার্কটিকা পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাত্রা

অস্ট্রেলিয়ায় থলিধারী প্রাণীদের বিস্তারের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রাচীন মহাদেশগুলোর সংযোগ। প্রায় ৪ কোটি থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে স্থলভিত্তিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল। বর্তমানের মতো বরফে আচ্ছাদিত না থাকায় অ্যান্টার্কটিকার কিছু অঞ্চলে তখন বনভূমি ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পরিবেশও ছিল।

বিজ্ঞানীদের একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো, প্রাচীন মার্সুপিয়ালদের পূর্বপুরুষেরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অ্যান্টার্কটিকা হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল। মহাদেশগুলোর সংযোগ ও প্রাণীদের জীবাশ্মের অবস্থান এই ধারণার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দেয়।

অ্যান্টার্কটিকার সিমোর দ্বীপে পাওয়া জীবাশ্মও এই অঞ্চলে প্রাচীন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উপস্থিতির তথ্য দেয়। এসব আবিষ্কার থেকে বোঝা যায়, অ্যান্টার্কটিকা শুধু বরফে ঢাকা বিচ্ছিন্ন মহাদেশ ছিল না, একসময় প্রাণীদের চলাচলের পথ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া প্রাচীন জীবাশ্ম কী বলছে?

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের টিংআমাররা এলাকায় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের স্তন্যপায়ী প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এসব জীবাশ্ম মহাদেশটিতে প্রাচীন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উপস্থিতি ও বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দেয়।

এ অঞ্চলে পাওয়া জারথিয়ার মতো প্রাচীন প্রাণী নিয়ে গবেষণা থেকে অস্ট্রেলিয়ার স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিবর্তন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বর্তমানের সব মার্সুপিয়ালের সরাসরি পূর্বপুরুষ হিসেবে কোনো একটি প্রাচীন প্রজাতিকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় না।

পরবর্তী কয়েক কোটি বছরে অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব পরিবেশে থলিধারী প্রাণীদের নানা গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে। কোয়ালা, ক্যাঙ্গারু ও ব্যান্ডিকুটের মতো প্রাণীদের পূর্বপুরুষেরা বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস ও বাসস্থানের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এভাবেই মহাদেশটিতে তাদের বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে।

কেন অস্ট্রেলিয়ায় এত থলিধারী প্রাণী টিকে আছে?

অস্ট্রেলিয়ায় মার্সুপিয়ালদের আধিক্যের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে অভিযোজন তাদের বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।

অস্ট্রেলিয়া অন্যান্য মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর সেখানে প্রাণীদের বিবর্তন অনেকটাই নিজস্ব ধারায় চলতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলের বনভূমি, তৃণভূমি ও শুষ্ক পরিবেশে থলিধারী প্রাণীরা নিজেদের উপযোগী বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলে। খাদ্য সংগ্রহ, শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচা এবং প্রজননের মতো বিষয়গুলোও তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মায়ের থলিতে শাবকের বেড়ে ওঠা তাদের প্রজননপ্রক্রিয়ার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তবে শুধু এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় তাদের আধিপত্য তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাস, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের সম্মিলিত প্রভাবেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানেও বিস্ময় জাগায় থলিধারী প্রাণীদের বৈচিত্র্য

আজ অস্ট্রেলিয়ায় ক্যাঙ্গারু, কোয়ালা, ওমব্যাট, ওয়ালাবি ও বিভিন্ন প্রজাতির পসামসহ অসংখ্য মার্সুপিয়াল দেখা যায়। প্রজাতির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ভর করে শ্রেণিবিন্যাস, কোন অঞ্চলকে হিসাবে ধরা হচ্ছে এবং কোন গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তার ওপর।

তবে এসব প্রাণীর গল্প শুধু অস্ট্রেলিয়ার নয়। তাদের পূর্বপুরুষদের বিস্তার, প্রাচীন মহাদেশগুলোর অবস্থান এবং কোটি কোটি বছরের বিবর্তন পৃথিবীর প্রাণিজগতের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে।

বর্তমানে কোনো প্রাণী যে অঞ্চলে বসবাস করছে, তার উৎপত্তিও যে সেখানেই হয়েছে, এমন নয়। কোয়ালা ও ক্যাঙ্গারুর ইতিহাস তারই উদাহরণ। প্রাচীন পৃথিবীর পরিবর্তনশীল ভূখণ্ড পেরিয়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা নতুন পরিবেশে পৌঁছেছিল। পরে সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বিবর্তনের ধারায় অস্ট্রেলিয়াকে থলিধারী প্রাণীদের অন্যতম প্রধান আবাসস্থলে পরিণত করেছে।

প্রতি / এডি /শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G