ময়না পাখি কীভাবে মানুষের কথা নকল করে, জানুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
মানুষের মতো কথা বলতে পারে ময়না পাখি। মানুষের মুখে শোনা শব্দ ও বাক্য অনুকরণ করে অনেক সময় এমনভাবে তা উচ্চারণ করে, যা শুনে মনে হতে পারে পাখিটি মানুষের ভাষা বুঝতে পারছে। কিন্তু ময়নার এই অসাধারণ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে বিশেষ শব্দ তৈরির অঙ্গ, শ্বাসপ্রশ্বাসের কৌশল এবং শোনা শব্দ শেখার দক্ষতা।
একসময় গ্রামবাংলার অনেক বাড়িতে খাঁচায় পোষা ময়না দেখা যেত। মানুষের মুখে ‘কেমন আছো’ কিংবা ‘কে রে’ ধরনের কথা শুনে সেগুলো আবার বলত পাখিটি। তবে মানুষের ভাষা অনুকরণ করতে পারলেও ময়না প্রতিটি বাক্যের অর্থ মানুষের মতো বোঝে, এমন প্রমাণ নেই।
ময়নার শব্দ তৈরির বিশেষ অঙ্গ
মানুষের কণ্ঠস্বর তৈরি হয় স্বরযন্ত্রের মাধ্যমে। ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাস স্বরতন্ত্রীতে কম্পন সৃষ্টি করে। পরে জিহ্বা, ঠোঁট ও মুখের নড়াচড়ায় সেই শব্দের রূপ বদলে যায়।
পাখিদের ক্ষেত্রেও শব্দ তৈরির জন্য রয়েছে বিশেষ অঙ্গ, যার নাম ‘সিরিংক্স’। এটি শ্বাসনালির নিচের দিকে, যেখানে শ্বাসনালি দুই ভাগ হয়ে ফুসফুসের দিকে গেছে। সিরিংক্সের ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম পর্দা বাতাসের প্রবাহে কেঁপে ওঠে। সংশ্লিষ্ট পেশিগুলো এসব পর্দার টান নিয়ন্ত্রণ করে শব্দের ধরন ও উচ্চতা বদলাতে সাহায্য করে।
সিরিংক্সের গঠন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে অনেক পাখি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় শব্দ তৈরি করতে পারে। ময়নার ক্ষেত্রেও এই অঙ্গ মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো শোনায় এমন শব্দ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কীভাবে মানুষের কণ্ঠস্বরের অনুকরণ করে
শুধু শব্দ তৈরি করলেই মানুষের কথার মতো শোনানো সম্ভব নয়। শব্দের সঙ্গে মিল রেখে মুখগহ্বর, জিহ্বা ও ঠোঁটের অবস্থানও বদলাতে হয়। ময়না এসব অঙ্গের নড়াচড়া ব্যবহার করে নিজের তৈরি শব্দকে পরিবর্তন করতে পারে। ফলে তার উচ্চারিত শব্দ মানুষের কথা বলে মনে হয়।
এ ছাড়া পাখির শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাও শব্দ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ফুসফুসের সঙ্গে যুক্ত বায়ুথলি বাতাসের চলাচল বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে সিরিংক্সের সমন্বয় পাখিকে বিভিন্ন ধরনের ডাক ও শব্দ তৈরি করতে সক্ষম করে।
শুনে শুনে কথা শেখে ময়না
ময়নার মানুষের কথা নকল করার আরেকটি বড় কারণ হলো তার শব্দ শেখার ক্ষমতা। কিছু পাখি অন্যের ডাক শুনে তা অনুকরণ করতে পারে। এই দক্ষতাকে বলা হয় ‘ভোকাল লার্নিং’।
ময়না মানুষের মুখে বারবার কোনো শব্দ শুনলে সেটির ধ্বনিগত ধরন শিখতে পারে এবং পরে নিজের কণ্ঠে তা পুনরুৎপাদনের চেষ্টা করে। নিয়মিত শোনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে শব্দের সঙ্গে তার উচ্চারণের মিল বাড়তে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়াকে মানুষের শিশুর ভাষা শেখার সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা ঠিক নয়। মানুষের ভাষা শেখার সঙ্গে শব্দের অর্থ, ব্যাকরণ ও জটিল চিন্তার সম্পর্ক রয়েছে। ময়নার শব্দ অনুকরণ করার ক্ষমতা থাকলেও তা দিয়ে মানুষের মতো ভাষা বোঝার বিষয়টি প্রমাণিত হয় না।
মানুষের কথা নকল করলেই কি ময়না অর্থ বোঝে?
ময়না কোনো পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট শব্দ বারবার শুনলে সেই শব্দের সঙ্গে পরিস্থিতিটির সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। ফলে কিছু শব্দ নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবহার করার মতো আচরণ দেখা যেতে পারে। কিন্তু শুধু মানুষের বাক্য অনুকরণ করলেই পাখিটি বাক্যের অর্থ বুঝেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
অর্থাৎ, ময়নার কথা বলার ক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো শব্দ তৈরি, শোনা শব্দ মনে রাখা এবং তা অনুকরণ করার দক্ষতা। এর সঙ্গে মানুষের মতো ভাষাগত উপলব্ধির পার্থক্য রয়েছে।
বন্য ময়নাকে বন্দী রাখার বিষয়েও সতর্কতা জরুরি
মানুষের কথা অনুকরণ করতে পারার কারণে ময়না দীর্ঘদিন ধরে পোষা পাখি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে বন্য পাখি ধরে খাঁচায় রাখা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও আচরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশে ময়না অন্য পাখির সঙ্গে যোগাযোগ করে, খাবার সংগ্রহ করে এবং স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ বজায় রাখে।
বাংলাদেশে বন্য প্রাণী সংরক্ষণসংক্রান্ত আইন ও বিধিনিষেধের আওতায় বন্য পাখি ধরা, রাখা বা বেচাকেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তাই ময়নাকে পোষার আগে সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ময়নার মানুষের মতো কথা বলার ক্ষমতা কোনো জাদু নয়। তার বিশেষ শব্দ তৈরির অঙ্গ, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা এবং শোনা শব্দ অনুকরণের দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করেই এই বিস্ময়কর ক্ষমতা তৈরি করে।
প্রতি / এডি / শাআ


















