তিন বছরের মধ্যে চা উৎপাদনে সর্বোচ্চ রেকর্ড

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৪৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

চলতি বছর দেশের চা শিল্পে শুরু থেকেই উৎপাদনের ধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির পর জুলাইয়েও উৎপাদন মোটের ওপর ভালো অবস্থানে ছিল। যদিও গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে উৎপাদন কমেছে, তবে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের হিসাবে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে।

উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গেলে চলতি বছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চা বোর্ডের কর্মকর্তা ও বাগান মালিকদের মতে, বছরের শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, অনুকূল আবহাওয়া এবং প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি চায়ের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, বাজারে ভালো দাম এবং চাহিদা থাকায় বাগান মালিকদের মধ্যে পরিচর্যা ও উৎপাদনে বিনিয়োগের আগ্রহও বেড়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, দেশে চায়ের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বাগানগুলোতে সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দেখা দিলে বাগানে কৃত্রিমভাবে পানি দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে বাজারে চায়ের দাম ভালো থাকায় সামগ্রিকভাবে উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

আগের তিন বছরের উৎপাদন

চা বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উৎপাদন। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজিতে।

২০২৫ সালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে উৎপাদন হয় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ২৭ হাজার কেজি। তবে ২০২৪ ও ২০২৫, দুই বছরেই নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

চলতি বছর দেশের চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি।

চা বোর্ডের বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে চা উৎপাদিত হয়েছিল ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার কেজি। ২০২৪ সালের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার কেজি।

অর্থাৎ চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি বা ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ৭০ লাখ ১ হাজার কেজি বা ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

জুলাইয়ে কমলেও সামগ্রিক হিসাবে এগিয়ে

মাসভিত্তিক হিসাব করলে জুলাইয়ে কিছুটা নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে ১ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। গত বছরের একই মাসে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার কেজি।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাই মাসে উৎপাদন কমেছে ১৩ লাখ ৭৯ হাজার কেজি।

তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের তুলনায় পরিস্থিতি ভিন্ন। ওই বছরের জুলাইয়ে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১৪ লাখ ৩৫ হাজার কেজি। সে হিসাবে চলতি বছরের জুলাইয়ে উৎপাদন ৬ লাখ ৭৫ হাজার কেজি বেশি হয়েছে।

জুন মাসে অবশ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে দেশে ৯৮ লাখ ২৫ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হলেও চলতি বছরের একই মাসে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৫ হাজার কেজি।

চা বোর্ডের হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে জুনে উৎপাদন বেড়েছে ২৫ লাখ ৮০ হাজার কেজি। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২৬ শতাংশ।

জুন শেষে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট চা উৎপাদন দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬ লাখ ৩১ হাজার কেজি। এটি ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে এলেও সাত মাসের সামগ্রিক হিসাবে গত দুই বছরের তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধির হার ১৯ শতাংশের বেশি রয়েছে।

কোন মাসে কত চা উৎপাদন

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ৫ লাখ ৭৩ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে উৎপাদন ছিল ২৪ হাজার কেজি।

এরপর মার্চে ২৫ লাখ ৫৮ হাজার কেজি, এপ্রিলে ৫৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি এবং মে মাসে ৯১ লাখ ৫৩ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়। জুনে উৎপাদন বেড়ে ১ কোটি ২৪ লাখ ৫ হাজার কেজিতে পৌঁছে। জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে ১ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার কেজিতে দাঁড়ায়।

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে ১২ লাখ ২৩ হাজার কেজি বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে। এপ্রিলে বাড়তি উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩৬ লাখ ৪৬ হাজার কেজি। মে মাসে ৫ লাখ ৫ হাজার কেজি এবং জুনে ২৫ লাখ ৮০ হাজার কেজি বেশি উৎপাদন হয়েছে।

ভালো দামেও বাড়ছে বাগান মালিকদের আগ্রহ

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান মনে করেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে শুধু আবহাওয়ার ভূমিকা নয়, বাজারে চায়ের ভালো দাম পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, এবার নিলামে চায়ের মূল্য ভালো থাকায় বাগান মালিকরা উৎপাদন থেকে তুলনামূলক ভালো আয় করতে পারছেন। পাশাপাশি চায়ের ন্যূনতম মূল্যস্তর থাকায় বাজারে দামের বিষয়ে একটি সুরক্ষা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাগানের পরিচর্যা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সুযোগও বেড়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের উৎপাদন দেশের চা শিল্পে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। বছরের বাকি সময়েও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং উৎপাদন সহায়ক উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকলে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজির বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G