যেভাবে পরিচ্ছন্নতার মডেল হয়ে উঠেছিল রাজশাহী
রাজশাহীর কোনো সড়কে হাঁটলে প্রথমেই চোখে পড়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ নেই, ফুটপাতও তুলনামূলক ঝকঝকে। সড়ক বিভাজক ও বিভিন্ন খোলা জায়গায় রয়েছে গাছপালা ও ফুলের সমারোহ। রাতের শহর আলোকিত থাকে পর্যাপ্ত সড়কবাতিতে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং নগরবাসীর সচেতনতার কারণে রাজশাহী ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীর পরিচিতি পেয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের শ্রম নয়, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সাধারণ মানুষেরও। শহরের বাসিন্দাদের অনেকেই এখন যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন। ফলে পরিচ্ছন্ন রাখার একটি অভ্যাস তৈরি হয়েছে নগরজীবনে।
উপশহর এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিনের ভাষায়, বাসাবাড়ি থেকে নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করা এবং সড়ক পরিষ্কারের ব্যবস্থা থাকায় মানুষও এখন রাস্তায় ময়লা ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তার মতে, শহর পরিষ্কার রাখার দায়িত্বে নাগরিকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
রাত নামলেই শুরু হয় পরিচ্ছন্নতার কাজ
রাজশাহীর বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় পরিবর্তন আসে ২০০৯ সালের জুলাইয়ে। ওই সময় চালু করা হয় রাতের বর্জ্য অপসারণ এবং সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনভিত্তিক ব্যবস্থা।
শহরের ৩০টি ওয়ার্ডে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো কাছাকাছি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে জমা করা হয়। সন্ধ্যার পর শুরু হয় সড়ক পরিষ্কারের কাজ। রাত ১০টার পর এসব কেন্দ্র থেকে ট্রাক ও ট্রেইলারের মাধ্যমে বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভোর হওয়ার আগেই রাস্তা থেকে ময়লা সরিয়ে ফেলা হয়। ড্রেন পরিষ্কারের সময় জমে থাকা কাদা বা বর্জ্যও সড়কের পাশে ফেলে না রেখে দ্রুত গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। ফলে দিনের শুরুতেই শহরের প্রধান সড়কগুলো আবার পরিচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরে আসে।
হাজারের বেশি কর্মীর নিয়মিত পরিশ্রম
এই বিশাল কার্যক্রম পরিচালনার পেছনে রয়েছে বিপুলসংখ্যক কর্মীর শ্রম। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে কাজ করছেন ১ হাজার ২৫৩ জন।
শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়, নগরীর পরিবেশ ঠিক রাখতে আলাদাভাবে কাজ করছেন আরও অনেকে। মশা নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ১২৮ জন কর্মী। গাছপালা ও বিভিন্ন পার্কের পরিচর্যায় দায়িত্ব পালন করছেন ৮০ জন। শহরের সড়কবাতি দেখভালের জন্য রয়েছেন ৭১ জন কর্মী। এসব কার্যক্রম তদারকিতে রয়েছেন ৬৪ জন পরিদর্শক।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী মুসলিম রেজা জানান, কোনো কর্মী অসুস্থ হলে তার কাজ যেন বন্ধ না থাকে, সে জন্য অন্য কর্মী দায়িত্ব সামলে নেন। তার মতে, নতুন কেউ শহরে এলেও সময়ের সঙ্গে এখানকার পরিচ্ছন্নতার পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
মানুষের অভ্যাসেও এসেছে পরিবর্তন
শুধু নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া বা ময়লা সরিয়ে নেওয়ার কারণে একটি শহর দীর্ঘদিন পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। রাজশাহীর ক্ষেত্রে নাগরিকদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে।
তালাইমারীর বাসিন্দা সুমাইয়া বিনতে সামাদ বলেন, অন্য জায়গায় অনেক সময় রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেট ফেলে দেওয়াকে মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবে নেয়। কিন্তু রাজশাহীতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে এমন কাজ করতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন।
তার মতে, রাস্তা যখন পরিষ্কার থাকে, তখন সেটি নোংরা না করার ব্যাপারে মানুষের মধ্যেও এক ধরনের দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
রাজশাহী সফরে আসা ঢাকার বাসিন্দা শিশির দাসও শহরের পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রশংসা করেছেন। তার চোখে, ঢাকার তুলনায় রাজশাহীর পরিষ্কার রাস্তা ও গোছানো পরিবেশ আলাদা করে নজরে পড়ে।
চাকরির কারণে সম্প্রতি রাজশাহীতে আসা মো. জাবির হোসেনেরও অভিজ্ঞতা একই রকম। তার মতে, শহরে ধুলা ও দূষণ তুলনামূলক কম। রাস্তার পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলো এবং বিভিন্ন জায়গায় গাছ ও ফুলের উপস্থিতি শহরটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি বেড়েছে সবুজ
রাজশাহী সবসময় বর্তমানের মতো সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ছিল না। একসময় শহরের অনেক জায়গায় ধুলা বেশি ছিল এবং গাছপালার সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক কম।
বছরের পর বছর রাস্তার পাশে, সড়ক বিভাজকে এবং বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে ধীরে ধীরে বদলে যায় নগরীর চেহারা।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণের কারণে রাজশাহী বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসা পেয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও রেড ক্রিসেন্টের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও শহরটি স্বীকৃতি পেয়েছে বলে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুনের দাবি, ২০১৩-১৪ সালেও বাতাসের ধুলিকণা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় ছিল রাজশাহী।
আরও আড়াই লাখ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা
বর্তমান সিটি করপোরেশনও পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহরের এই অবস্থান ধরে রাখতে নতুন পরিকল্পনা করছে। আগামী এক বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন।
এই কর্মসূচিতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য শুধু গাছ লাগানো নয়, নগরীর পরিবেশের সঙ্গে নাগরিকদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা।
একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহের বর্তমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কমানো হবে পলিথিনের ব্যবহারও।
পলিথিনের বিকল্প ব্যবহারে জোর
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর মধ্যে কয়েক লাখ পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল ব্যাগ বিতরণ করেছে সিটি করপোরেশন। ভবিষ্যতে রাজশাহীকে ধীরে ধীরে পলিথিনমুক্ত শহরে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করেন প্রশাসক। কারণ পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে বেশি। সাধারণ মানুষকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা গেলে এসব বিকল্প পণ্য ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব বলে তার মত।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনও কিছু ঘাটতি
পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও রাজশাহীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সাধারণ বর্জ্য থেকে আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়। সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে।
তবে সাধারণ বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ বা সার তৈরির মতো বড় পরিসরের ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। এ ঘাটতি পূরণে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে সিটি করপোরেশন।
পরিকল্পিত প্রকল্পে বর্জ্যপানি, কঠিন বর্জ্য ও চিকিৎসা বর্জ্যের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা থাকবে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের উপযোগী আধুনিক একটি কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
শহর বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
রাজশাহী দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত নতুন মানুষ শহরে আসছেন, বাড়ছে বসতি ও নাগরিক চাহিদা। ফলে বর্তমান পরিচ্ছন্নতার মান ধরে রাখাই এখন কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুনের মতে, ভবিষ্যতেও রাজশাহীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। সেগুলো হলো সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিতভাবে ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চালানো এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
সিটি করপোরেশন ময়লার ঝুড়ি, পরিবহনব্যবস্থা, স্থানান্তর কেন্দ্র ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিশ্চিত করতে পারে। কর্মীরা নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার ও বর্জ্য অপসারণও করতে পারেন। কিন্তু নগরবাসী যদি যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেন, তাহলে কোনো ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব করবে না।
রাজশাহীর পরিচ্ছন্নতার সাফল্যের মূল শিক্ষা তাই শুধু আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়। প্রশাসনের নিয়মিত উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের বদলে যাওয়া অভ্যাস ও দায়িত্ববোধই এই শহরকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















