এআই কি এবার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার খেলায় নামছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কাজের গতি বাড়ানো থেকে শুরু করে তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নানা ক্ষেত্রেই এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই প্রযুক্তির কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। আর সেই ঝুঁকির একটি দিক হয়তো সাইবার হামলার চেয়েও বেশি উদ্বেগের।
এআই ও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন প্রযুক্তিবিদ মনে করেন, সাইবার হামলা যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক অচল করে দিতে পারে, তেমনি এআইয়ের একটি বিশেষ আচরণ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ইন্টারনেটনির্ভর নেটওয়ার্কে বহুল পরিচিত একটি হামলা হলো ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সার্ভিস বা DDoS। এ ধরনের আক্রমণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক অনুরোধ বা ডেটা প্যাকেট একসঙ্গে কোনো নেটওয়ার্কের দিকে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত চাপ সামলাতে না পেরে সার্ভার বা নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ধীর হয়ে যেতে পারে কিংবা পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। কয়েক ঘণ্টা নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকলে গ্রাহকরা সেবা থেকে বঞ্চিত হন, কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে সাইবার হামলা আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে এআইয়ের ঝুঁকি শুধু সাইবার নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আরেকটি সূক্ষ্ম সমস্যা হলো, ব্যবহারকারী যে ধারণা নিয়ে এআইয়ের কাছে প্রশ্ন করেন, অনেক সময় উত্তর দেওয়ার সময় এআই সেই ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করার বদলে সেটির পক্ষে যুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।
ধরা যাক, কেউ একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান। তার আগে থেকেই ধারণা রয়েছে যে ওই ব্যবসার বাজার বিশাল এবং অল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের লাভ করা সম্ভব। তিনি যদি এআইকে প্রশ্ন করেন, কেন তার ব্যবসার পরিকল্পনা সফল হবে, তাহলে এআই খুব সহজেই সম্ভাব্য সাফল্যের পক্ষে একাধিক যুক্তি তুলে ধরতে পারে।
এতে ব্যবহারকারীর মনে হতে পারে, তার প্রাথমিক ধারণাটিই হয়তো সঠিক।
কিন্তু একই ব্যক্তিই যদি প্রশ্নের ধরন পাল্টে জানতে চান, তার ব্যবসাটি কেন ব্যর্থ হতে পারে, তাহলে এআই এবার সম্ভাব্য ব্যর্থতার কারণ, বাজারের ঝুঁকি এবং গ্রাহকের অনাগ্রহের বিষয়গুলোও তুলে ধরতে পারে।
এখানেই তৈরি হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ব্যবহারকারী যদি আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান এবং শুধু সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি খুঁজতে এআই ব্যবহার করেন, তাহলে প্রযুক্তিটি তার চিন্তার দুর্বল জায়গাগুলো সামনে আনার পরিবর্তে উল্টো সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বলা হয়। অর্থাৎ মানুষ সাধারণত নিজের বিশ্বাস বা ধারণার সঙ্গে মেলে এমন তথ্য গ্রহণ করতে বেশি আগ্রহী এবং বিপরীত তথ্যকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেয়।
এআইয়ের সঙ্গে এই মানসিক প্রবণতার সংযোগ তৈরি হলে সমস্যাটি আরও জটিল হতে পারে। কারণ ব্যবহারকারী যদি প্রশ্নই এমনভাবে করেন, যাতে একটি নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে, তাহলে পাওয়া উত্তরকে বাস্তবতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষ করে ব্যবসা, ক্যারিয়ার কিংবা বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিপজ্জনক হতে পারে। কোনো একটি ধারণা সম্পর্কে এআইয়ের কাছ থেকে একের পর এক ইতিবাচক যুক্তি পাওয়ার পর ব্যবহারকারী অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু বাস্তব বাজার, গ্রাহকের আচরণ, প্রতিযোগিতা কিংবা আর্থিক ঝুঁকি সেই ধারণার সঙ্গে নাও মিলতে পারে।
এ কারণে এআইকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। বরং এটিকে সম্ভাব্য তথ্য, যুক্তি এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যাচাইয়ের একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
একটি ভালো পদ্ধতি হতে পারে, নিজের ধারণার পক্ষে যুক্তি চাওয়ার পাশাপাশি এআইকে সেই ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তি দিতেও বলা। কোন তথ্য ধারণাটিকে ভুল প্রমাণ করতে পারে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়, কী কী তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন এবং কোন পরিস্থিতিতে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হতে পারে, এসব প্রশ্নও করা জরুরি।
সবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব তথ্য, নির্ভরযোগ্য উৎস এবং মানুষের পেশাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এআইয়ের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ এআই যতই শক্তিশালী হোক, ব্যবহারকারীর প্রত্যাশিত উত্তর পাওয়ার বিষয়টি আর বাস্তব সত্য একই জিনিস নয়। প্রযুক্তিকে নিজের চিন্তার আয়না বানানোর বদলে যদি নিজের চিন্তাকে যাচাই করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলেই এর সুফল সবচেয়ে বেশি পাওয়া সম্ভব।
প্রতি / এডি / শাআ



















