মুরগিচোরের বদনাম পেরিয়ে কৃষি ও প্রকৃতির নীরব সহায়ক খ্যাঁকশিয়াল

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৪৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৪৯ অপরাহ্ণ

লোকালয়ের আশপাশে খ্যাঁকশিয়াল দেখলেই অনেকের মনে প্রথম যে কথাটি আসে, তা হলো মুরগি ধরে খাওয়া। মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাণীটির পরিচয় যেন ‘মুরগিচোর’ হিসেবেই আটকে আছে। কিন্তু গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র। খ্যাঁকশিয়াল শুধু শিকারি প্রাণী নয়, কৃষিজমিতে ইঁদুর ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকৃতি ও কৃষির ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে।

তবে মানুষের বসতি বাড়তে থাকা, বন ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়া, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অকারণে খ্যাঁকশিয়াল হত্যা করার প্রবণতা প্রাণীটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এর আবাসস্থল ও প্রজননের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পঞ্চগড়ে ক্যামেরায় ধরা পড়ল খ্যাঁকশিয়ালের জীবন

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়। জেলার আটোয়ারী উপজেলার একটি নিরিবিলি কবরস্থানকে ঘিরে তিন মাস ধরে খ্যাঁকশিয়ালের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করেন একদল গবেষক। এজন্য ব্যবহার করা হয় স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা-ট্র্যাপ।

গবেষকদের লক্ষ্য ছিল বাংলা খ্যাঁকশিয়াল বা বেঙ্গল ফক্সের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা। ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাদের চলাফেরা, শিকার, খাবার সংগ্রহ, শাবকদের লালন-পালন, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অন্য প্রাণীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের নানা দৃশ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষজ্ঞও এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময়ের ভিডিও বিশ্লেষণ করে খ্যাঁকশিয়ালের জীবনযাপন সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

ছোট আকারের এই শিকারি প্রাণী

বাংলা খ্যাঁকশিয়াল ভালপেস গণের একটি ছোট মাংসাশী স্তন্যপায়ী। সাধারণত এর ওজন প্রায় ১ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৬ কেজি এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। খড়ের মতো রঙের শরীর ও লোমশ লেজ এ প্রাণীটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

প্রজননের সময় খ্যাঁকশিয়াল মাটির নিচে গর্ত তৈরি করে। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা মিললেও বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশে এদের সংখ্যা ও বিস্তৃতি আগের তুলনায় কমেছে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার বাংলাদেশের লাল তালিকায় বাংলা খ্যাঁকশিয়ালকে ‘বিপদাপন্ন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনেও বাড়ছে ঝুঁকি

উত্তরবঙ্গের খোলা শুষ্ক জমি ও তৃণভূমি খ্যাঁকশিয়ালের পছন্দের আবাস। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসায় এসব জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

অতিরিক্ত বন্যাও প্রাণীটির জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ মাটির নিচে থাকা গর্ত পানিতে ডুবে গেলে বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে শাবকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।

বাংলাদেশে বর্তমানে যমুনা ও পদ্মার পশ্চিমাঞ্চলেই খ্যাঁকশিয়ালের উপস্থিতির তথ্য বেশি পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের বসতি সম্প্রসারণ, প্রাকৃতিক আবাস নষ্ট হওয়া এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে প্রাণীটি অনেকটা আড়ালে চলে গেছে।

তিন মাসের পর্যবেক্ষণে হাজারো ভিডিও

২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার একটি কবরস্থান এলাকায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়। সেখানে খ্যাঁকশিয়ালের একটি গর্তকে কেন্দ্র করে ক্যামেরা-ট্র্যাপ বসানো হয়েছিল।

গবেষকেরা মোট ১২ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেন। এসব ফুটেজে খ্যাঁকশিয়ালের ৪ হাজার ৫০০টির বেশি ভিডিও ক্লিপ পাওয়া যায়।

গবেষক দলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ, মো. রোকনুজ্জামান, সুলতান আহমেদ ও মোহাম্মদ সামিউল আলম। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেইরি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. ম্যাক্সিমিলিয়ান অ্যালেনও গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।

‘ডেন-সাইট বিহেভিয়ার অব বেঙ্গল ফক্স (ভালপেস বেঙ্গালেনসিস) রিভিলস পারসিস্টেন্ট ইউজ, সোশ্যাল ইন্টারেকশনস, অ্যান্ড কো-এক্সিস্টেনস ইন শেয়ারড স্পেসেস’ শিরোনামে গবেষণাটি এ বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোল্যুশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

গর্তকে ঘিরেই তাদের ব্যস্ততা

গবেষণায় দেখা গেছে, খ্যাঁকশিয়াল নিজেদের গর্তের জায়গা বারবার ব্যবহার করে এবং প্রজনন মৌসুমে সেখানে তাদের উপস্থিতি অনেক বেড়ে যায়।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে গর্তের আশপাশে তাদের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। শাবকদের বড় করার সময়ও বাবা-মা নিয়মিত গর্তের আশপাশে অবস্থান করে। মে মাসের দিকে শাবক কিছুটা বড় হয়ে গেলে তাদের এই আনাগোনা কমে আসে।

একটি গর্তের আশপাশে একই সময়ে সর্বোচ্চ ছয়টি খ্যাঁকশিয়াল দেখা গেছে। সাধারণত ভোর ও সন্ধ্যার সময় এরা বেশি সক্রিয় থাকে।

ভোর সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৬টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে তাদের চলাচল বেশি ছিল। দিনের বেলা বাইরে কম বের হওয়ার বিষয়টি মানুষের পাশাপাশি বড় শিকারি প্রাণীর হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখার কৌশল হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

খাবারের তালিকায় ইঁদুর ও পোকামাকড়

খ্যাঁকশিয়ালকে শুধু মুরগি ধরে খাওয়া প্রাণী হিসেবে দেখলে তাদের প্রকৃত ভূমিকার একটি বড় অংশই অজানা থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এরা সুযোগ বুঝে বিভিন্ন ধরনের ছোট প্রাণী শিকার করে।

৫৪০টি ভিডিও ক্লিপে তাদের খাবার সংগ্রহ ও খাওয়ার দৃশ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসবের মধ্যে ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে গবেষকেরা খাবারের ধরন শনাক্ত করতে পেরেছেন।

তাদের খাদ্যতালিকায় ছিল পোকামাকড়, ছোট পাখি ও ইঁদুর। মোট শনাক্ত খাবারের প্রায় ১৯ শতাংশ ছিল বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। পাখির উপস্থিতি পাওয়া গেছে প্রায় ১৮ শতাংশ ক্ষেত্রে। ইঁদুর ছিল প্রায় ৮ শতাংশ।

শাবক পালনের সময়ে বড় খ্যাঁকশিয়ালদের তুলনামূলক বড় শিকার নিয়ে গর্তে ফিরতে দেখা গেছে। এর মাধ্যমে শাবকদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উইপোকাও শাবকদের প্রিয় খাবার

শাবকদের বড় হওয়ার পর্যায়ে গর্তের কাছাকাছি সহজে পাওয়া যায় এমন ছোট প্রাণী ও পোকামাকড় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হয়ে ওঠে।

গবেষণার ১৬টি ভিডিওতে দেখা গেছে, মাটি থেকে উইপোকার দল বের হওয়ার সময় শাবকেরা সেগুলো খাচ্ছে। ফলে গর্তের কাছাকাছি পাওয়া উইপোকাকে শাবকদের জন্য সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

তবে এই গবেষণায় সাপ, উদ্ভিদজাত খাবার কিংবা মানুষের ফেলে যাওয়া খাবার খাওয়ার কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি। যদিও ভারতের ওডিশায় করা অন্য একটি গবেষণায় বাংলা খ্যাঁকশিয়ালের এমন খাদ্যাভ্যাসের তথ্য পাওয়া গেছে।

শাবকদের জীবনের প্রথম দিকে মায়ের দুধই প্রধান খাদ্য। পঞ্চগড়ের ক্যামেরা ফুটেজেও মা খ্যাঁকশিয়ালকে শাবকদের দুধ খাওয়াতে দেখা গেছে।

পরিবারে খেলাধুলা ও সামাজিক যোগাযোগ

সাধারণ সময়ে খ্যাঁকশিয়াল অনেকটা একাকী জীবন কাটালেও প্রজনন ও শাবক লালন-পালনের সময় তাদের আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। বাবা-মা তখন জোড়ায় থাকে এবং শাবকদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ে।

গবেষণায় মোট ১৬ ধরনের আচরণ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ ধরনের সামাজিক আচরণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৪২৫টি সামাজিক আচরণের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ছিল শাবকদের খেলাধুলা। মোট ৩২৭টি ক্লিপে তাদের নিজেদের মধ্যে কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলতে দেখা গেছে।

আরও ৫০টি ভিডিওতে খ্যাঁকশিয়ালদের পরস্পরকে অভিবাদন জানানোর আচরণ ধরা পড়ে। এ সময় তারা লেজ নাড়ানো, মুখ ও শরীর শোঁকা এবং বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গি করত।

এ ছাড়া ২১টি ভিডিওতে এক খ্যাঁকশিয়ালকে অন্যটির শরীরের লোম পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। চাটা, কামড়ানো বা আঁচড়ানোর মাধ্যমে এ ধরনের পরিচর্যা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার একটি আচরণ হতে পারে।

শাবক বা পূর্ণবয়স্ক খ্যাঁকশিয়ালের একে অপরের ওপর ওঠার দৃশ্যও ১৩টি ক্লিপে পাওয়া গেছে। গবেষকেরা এটিকে সামাজিক আধিপত্য প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত আচরণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

শাবকদের খেলাধুলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিকার ও আত্মরক্ষার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতাও তৈরি হতে পারে।

গর্ত নিয়ে গুইসাপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

খ্যাঁকশিয়ালের গর্তের আশপাশে শুধু তাদের নিজেদেরই আনাগোনা ছিল না। ক্যামেরায় সাত প্রজাতির পাখিও ধরা পড়ে। এ ছাড়া পাতিশিয়াল ছয়বার এবং কুকুর পাঁচবার ওই এলাকায় আসে। মানুষের উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে ৩৪ বার।

তবে গবেষকদের নজর কেড়েছে বাংলা গুইসাপের সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালের সম্পর্ক।

পঞ্চগড়ের গবেষণায় ৪৪৭টি ভিডিও ক্লিপে খ্যাঁকশিয়াল ও গুইসাপকে একই এলাকায় দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৬টি ঘটনায় গুইসাপ দেখামাত্র খ্যাঁকশিয়াল তেড়ে গিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

আরও ৩১টি ভিডিওতে গুইসাপের উপস্থিতিতে খ্যাঁকশিয়ালকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে দেখা গেছে। মাত্র দুটি ঘটনায় তাদের পিছু হটার দৃশ্য পাওয়া যায়।

গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে অন্যতম কারণ শাবকদের নিরাপত্তা। বিভিন্ন অঞ্চলের আগের গবেষণায় গুইসাপের খ্যাঁকশিয়াল শাবক শিকারের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া গুইসাপও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য খ্যাঁকশিয়ালের পরিত্যক্ত গর্ত ব্যবহার করতে পারে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গুইসাপের প্রজননকাল হওয়ায় এ সময়ে নিরাপদ গর্তের প্রয়োজন বাড়ে। ফলে একই গর্তকে ঘিরে দুই প্রজাতির মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

মানুষের কাছাকাছিও থাকতে পারে খ্যাঁকশিয়াল

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

যে গর্তকে কেন্দ্র করে গবেষণা হয়েছে, তার মাত্র ২০ মিটার দূরেই ছিল একটি পাকা রাস্তা। এরপরও মানুষের চলাচল এবং ক্যামেরা-ট্র্যাপের উপস্থিতি খ্যাঁকশিয়ালের স্বাভাবিক আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়নি।

ক্যামেরার সামনে আসার পরও তারা দীর্ঘ সময় এলাকায় ঘোরাফেরা করেছে। অর্থাৎ মানুষ সরাসরি তাদের ক্ষতি না করলে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে লোকালয়ের কাছেও এই প্রাণী টিকে থাকতে পারে।

বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী ও বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদের পর্যবেক্ষণও এমনই। তাঁর মতে, খ্যাঁকশিয়াল যথেষ্ট অভিযোজনক্ষম। মানুষের বসতি বা ব্যস্ত রাস্তার কাছেও তারা থাকতে পারে, যদি সরাসরি আক্রমণ বা হয়রানির শিকার না হয়।

তিনি মনে করেন, খাবার সংগ্রহ, বিশ্রাম ও চলাচলের ক্ষেত্রে খ্যাঁকশিয়াল নিজেদের মতো করে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। তাই সহনশীলতা থাকলে মানুষ ও এই বন্য প্রাণীর সহাবস্থান সম্ভব।

শাবকদের নিরাপত্তায় বাবা-মায়ের কৌশল

প্রজনন মৌসুমে খ্যাঁকশিয়ালের বাবা-মা শাবকদের নিরাপদ রাখতে গর্তের আশপাশে নিয়মিত নজর রাখে। বিপদের আভাস পেলেই তাদের আচরণে সতর্কতা দেখা যায়।

গর্তের একাধিক মুখ থাকাও তাদের আত্মরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বিপদ এলে দ্রুত অন্য মুখ দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

পাতিশিয়াল ও পোষা কুকুরের মতো প্রাণী শাবকদের জন্য হুমকি হতে পারে। তবে পঞ্চগড়ের গবেষণায় ক্যামেরায় এসব প্রাণীর সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালের সরাসরি সংঘর্ষ ধরা পড়েনি।

গবেষকদের মতে, খ্যাঁকশিয়াল এমন সময় বেশি চলাফেরা করে যখন মানুষ ও বড় শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ভোর ও গোধূলিকে বেছে নেওয়াও সম্ভবত তাদের টিকে থাকার কৌশলের অংশ।

বাংলা খ্যাঁকশিয়াল নিয়ে নতুন তথ্য

পঞ্চগড়ের গবেষণার একটি বিশেষত্ব হলো, গর্তকে কেন্দ্র করে বাংলা খ্যাঁকশিয়ালের আচরণ ক্যামেরা-ট্র্যাপের মাধ্যমে এত বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণের নজির আগে খুবই সীমিত ছিল।

গবেষক মুনতাসির আকাশের মতে, অন্যান্য প্রজাতির খ্যাঁকশিয়ালের গর্তনির্ভর জীবন নিয়ে গবেষণা থাকলেও শাবক লালন-পালন, খাবার সংগ্রহ এবং প্রজনন মৌসুমে বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলার কৌশল একসঙ্গে এভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ আগে পাওয়া যায়নি।

ফলে পঞ্চগড়ের এই গবেষণা বাংলা খ্যাঁকশিয়ালের জীবন সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

সংরক্ষণে শুধু বন নয়, গ্রামও গুরুত্বপূর্ণ

বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক রাকিবুল হাসান মুকুলের মতে, মানুষের বসতি সম্প্রসারণের কারণে খ্যাঁকশিয়ালের আবাসস্থল ক্রমেই কমছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বন ও প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় কেটে বসতি গড়ে ওঠায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে খ্যাঁকশিয়াল রক্ষায় বন বিভাগের আলাদা কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি নেই। তবে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে খ্যাঁকশিয়ালসহ অন্যান্য ছোট বন্য প্রাণী রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

গবেষকদের মতে, খ্যাঁকশিয়াল সংরক্ষণ করতে বড় কোনো বনভূমি রক্ষা করাই একমাত্র পথ নয়। গ্রামের ছোট ঝোপঝাড়, পতিত জমি, ছোট বনাঞ্চল, কবরস্থান এবং উইপোকার ঢিবির মতো জায়গাগুলোও তাদের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

খ্যাঁকশিয়াল কমলে কৃষিরও ক্ষতি

প্রকৃতিতে খ্যাঁকশিয়ালের ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইঁদুর ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ। কৃষিজমিতে এসব প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে গেলে ফসলের ওপর চাপ বাড়ে। তখন কৃষকেরা অনেক সময় অতিরিক্ত কীটনাশকের ওপর নির্ভর করেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি বাড়ার বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। একই সময়ে ছোট মাংসাশী প্রাণী ও সাপের সংখ্যা কমে গেলে ইঁদুরের ওপর প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়।

এই জায়গাতেই খ্যাঁকশিয়ালের মতো প্রাণীর গুরুত্ব রয়েছে। তারা ইঁদুর ও বিভিন্ন পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে এসব প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজের মতে, নিরাপদ পরিবেশ পেলে খ্যাঁকশিয়াল মানুষের বসতির কাছাকাছিও টিকে থাকতে পারে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে ছোট এই মাংসাশী প্রাণীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতি থেকে একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু ওই প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য অংশেও এর প্রভাব পড়ে।

বাঁচাতে হলে বদলাতে হবে মানুষের ধারণা

খ্যাঁকশিয়ালকে দীর্ঘদিন ধরে মুরগি ধরে খাওয়া প্রাণী হিসেবে দেখার কারণে অনেক এলাকায় মানুষ তাদের দেখলেই তাড়িয়ে দেয় বা হত্যা করে। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, এই প্রাণীর ভূমিকা এর চেয়ে অনেক বড়।

মানুষের আশপাশে থাকা খোলা জায়গা ও ছোট প্রাকৃতিক আবাসগুলো রক্ষা করা গেলে খ্যাঁকশিয়াল টিকে থাকার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে অকারণে তাদের হত্যা না করা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

গবেষকদের মতে, সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু করার জন্য কোনো প্রাণী একেবারে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা ঠিক নয়। মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলোর প্রতিও আগে থেকেই নজর দেওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষা কেবল পরিবেশের জন্য নয়, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। খ্যাঁকশিয়ালের মতো একটি ছোট প্রাণী তাই শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, কৃষিজমির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রকৃতিতে তাদের উপস্থিতি যতদিন থাকবে, ততদিন ইঁদুর ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের মতো কিছু কাজও প্রাকৃতিকভাবেই চলতে থাকবে। তাই খ্যাঁকশিয়ালকে শুধু ‘মুরগিচোর’ হিসেবে দেখার বদলে প্রকৃতির একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখার সময় এসেছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G