মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় মোচা বন্দর ও পেরিম দ্বীপ যেভাবে দখলে নেয় হুতিরা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ সময়ঃ ৮:০৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:১৫ অপরাহ্ণ

Mocha and Perim portsমাত্র দেড় দিনের ব্যবধানে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ মোচা বন্দর ও কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে হুতিবিরোধী বাহিনী। ইরান-সমর্থিত হুতিদের দ্রুত অভিযানের মুখে মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় এলাকাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অথচ কয়েক সপ্তাহ ধরেই বড় ধরনের হামলার আশঙ্কার কথা জানানো হচ্ছিল।

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইয়েমেনি বাহিনীর পাশাপাশি সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার ওপরও নির্ভরতা ছিল। এমনকি সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার জন্য শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টাও দেশটিতে অবস্থান করছিলেন। তবু শেষ পর্যন্ত মোচা ও পেরিমের পতন ঠেকানো যায়নি।

সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আকাশপথে প্রত্যাশিত সহায়তা না পাওয়া, ইয়েমেনি বাহিনীর সাংগঠনিক দুর্বলতা, কাগজে-কলমে থাকা ‘ভূতুড়ে’ সেনা এবং হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এই দ্রুত পতনের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশমুখে হুতিদের প্রভাব আরও বাড়ল। আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাওয়ায় ইরান ও তার মিত্রদের কৌশলগত অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে।

প্রত্যাশিত বিমান সহায়তা আসেনি

মোচা দখলের দিকে হুতিদের বড় ধরনের অগ্রযাত্রা শুরু হয় বৃহস্পতিবার সকালে। ইয়েমেনের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানান, বিপুলসংখ্যক হুতি যোদ্ধা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, এমনকি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও হামলায় অংশ নেয়।

পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকলে ওই কর্মকর্তা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আকাশপথে সহায়তা আসতে পারে।

কিন্তু প্রত্যাশিত সেই বিমান সহায়তা শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই মোচা বন্দর হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এর মাত্র একদিন পর পেরিম দ্বীপও দখলে নেয় হুতি বাহিনী।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ?

পেরিম খুব বড় কোনো দ্বীপ নয়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থিত এবং এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে দুটি প্রবেশপথে ভাগ করেছে।

লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগর এবং পরবর্তী সময়ে আরব সাগরের সংযোগের ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এর আশপাশে সামরিক উপস্থিতি থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারি বা চাপ তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়।

মোচা ও পেরিমের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় হুতিদের হাতে এখন এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের কাছে সৌদির সহায়তা চাওয়ার দাবি

আকাশপথে সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সৌদি নেতৃত্ব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়েছিল বলে জানা গেছে।

সিএনএনের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি দাবি করেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুই দফা ফোনে কথা বলেন। হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার অনুমতি দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করেছিলেন বলেও ওই ব্যক্তি জানান।

তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের বক্তব্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরে অবাধ নৌ চলাচলসহ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষাই ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় মিত্রদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করলেও ইয়েমেনি বা সৌদি বাহিনীর হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না।

শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা থাকলেও পতন

হুতিদের দ্রুত সাফল্যের বিষয়টি আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠেছে সৌদি আরবে থাকা মার্কিন সামরিক সদস্যদের উপস্থিতির কারণে।

এর আগে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হুতিবিরোধী সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার জন্য ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে।

ইরান ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, এমন আশঙ্কার পর নতুন একটি যৌথ বাহিনী কমান্ডের কাঠামোর মধ্যেও মার্কিন কর্মকর্তারা কাজ করছিলেন।

এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি অভিযানের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট মার্কিন সামরিক সদস্যের মোট সংখ্যা প্রায় ২০০।

হুতিদের হামলার সময় সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও সমন্বয় বৈঠকে অংশ নিতে সৌদি আরবে ছিলেন বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সামরিক উপদেষ্টা ও গোয়েন্দা সহায়তা থাকলেও তা দ্রুত আকাশ হামলার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

‘ভূতুড়ে’ সেনায় দুর্বল প্রতিরক্ষা

মোচা পতনের পেছনে শুধু মার্কিন বিমান সহায়তার অনুপস্থিতিই দায়ী ছিল না। ইয়েমেনের হুতিবিরোধী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোচায় হুতিদের প্রতিরোধে থাকা কয়েকটি সামরিক ইউনিটের প্রকৃত সক্ষমতা সরকারি নথিতে দেখানো সংখ্যার তুলনায় অনেক কম ছিল।

অভিযান সম্পর্কে অবগত এক পশ্চিমা কর্মকর্তার দাবি, ইয়েমেনি সামরিক ইউনিটগুলোর তালিকায় এমন অনেক নাম ছিল, যারা বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন না। অর্থাৎ সরকারি বেতন তালিকায় থাকা এসব ‘ভূতুড়ে’ সেনা বাস্তবে প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেননি।

কাগজে যে সংখ্যক সেনা দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তাদের প্রায় ২০ শতাংশের মতো যুদ্ধ করার অবস্থায় ছিল বলে ধারণা করা হয়।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল হুতিবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক বিভক্তি। আরব উপদ্বীপের নিরাপত্তা বিষয়ে বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল বাশার মতে, এসব বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। একই সঙ্গে তাদের জন্য কার্যকর একক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ছিল না।

সামনে আরও বড় ঝুঁকি

মোচা ও পেরিমের নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের হিসাব বদলায়নি, এর প্রভাব আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও পড়তে পারে।

পেরিম দ্বীপ বাব আল-মান্দাবের কাছে অবস্থিত। এই সরু নৌপথ দিয়েই লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরের দিকে যাতায়াত করা হয়। ফলে এখানে কোনো পক্ষের সামরিক নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত হওয়ার পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কিছু তেল পরিবহনও বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরমুখী হওয়ার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

উপকূলের আরও কিছু এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে এলে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা বা নৌযান ব্যবহার করে সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ তাদের বাড়তে পারে।

এখানেই কি থামবে হুতিদের অগ্রযাত্রা?

মোচা ও পেরিম দখলের পর হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট ছবি ও উন্মুক্ত উৎস থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে হুতিদের নতুন করে সেনা মোতায়েনের ইঙ্গিত মিলেছে।

এতে ধারণা করা হচ্ছে, তারা পূর্ব দিকে আরও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, কয়েক সপ্তাহের আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা সহায়তা এবং বিপুলসংখ্যক সামরিক উপদেষ্টা থাকার পরও যখন মোচা ও পেরিমকে রক্ষা করা গেল না, তখন হুতিদের পরবর্তী অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G