তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে লোডশেডিং হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন জীবন, পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়ছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানি সংকটও। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও তেল সরবরাহে নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যাও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাধারণত গ্রীষ্মে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং করে রাজধানী, বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এবার সেই চাপ এসে পড়েছে রাজধানীর ওপরও।
রাজধানীতেও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট
রাজধানীর বাড্ডা, খিলগাঁও, তেজগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কোনো কোনো এলাকায় একটানা প্রায় দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় কিংবা রাতের দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঘরোয়া কাজেও সমস্যা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় নির্দিষ্ট না থাকায় দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারে ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হচ্ছে। আইসক্রিম ও হিমায়িত পণ্যের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, শিশুদের পড়তে বসানোর সময়ই অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ চলে যায়। কখনো সন্ধ্যার পর, আবার কখনো রাত ১০টা বা ১১টার পর বিদ্যুৎ থাকছে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে জেনারেটর চালিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করাও সম্ভব হচ্ছে না।
আগস্টে সর্বোচ্চ লোডশেডিং
পিডিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট রাত ১টার দিকে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ উঠেছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। চলতি বছরের মধ্যে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং।
এর এক মাস পর ১০ সেপ্টেম্বরও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট। ওই দিন একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহও প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
এ বছর কোনো কোনো দিনে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বলে পিডিবির হিসাবে উঠে এসেছে। তবে বিদ্যুৎ বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে প্রকৃত চাহিদা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
জ্বালানি সংকট বাড়াচ্ছে চাপ
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এলএনজি সরবরাহের ঘাটতি, গ্যাস টার্মিনালের ত্রুটি, কয়লা ও তেলের সংকট এবং আদানি পাওয়ারের সরবরাহ কমে যাওয়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজন অনুযায়ী সব সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে বাড়ছে চাহিদা, অন্যদিকে জ্বালানির সংকটে কমছে উৎপাদন। দুইয়ের ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের আকারে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হবে না।
তার মতে, এ বছর বিদ্যুতের চাহিদা ইতোমধ্যে ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি গরমের সময়ও আগের তুলনায় দীর্ঘ হচ্ছে। সেপ্টেম্বরেও তীব্র গরম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কমছে না। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সংকট একসঙ্গে বিবেচনা করে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
উৎপাদন খরচ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানেও নজর দিতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমানো, সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ এবং যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র সামান্য রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত সচল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। তার মতে, শুধু ভবিষ্যতে ১০ হাজার মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘোষণা দিলেই হবে না, কোন কেন্দ্র কখন চালু করা হবে এবং কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো হবে, তার বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ এখনই শুরু করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ সংকট ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। ফলে শুধু বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
আগামী দিনের চাহিদা বিবেচনায় দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান থেকেই যাবে। আর সেই ব্যবধান পূরণ করতে গিয়ে লোডশেডিংয়ের চাপ বারবার সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কাই থেকে যাবে।
প্রতি / এডি / শাআ























