পোল্যান্ডে হয়ে গেল বিশ্বের প্রথম রোবটদের আন্দোলন, কী দাবি ছিলো তাদের?

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ সময়ঃ ৯:২৩ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:২৩ অপরাহ্ণ

The world's first robot movementকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কতটা বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে, সেই প্রশ্ন এবার সামনে এলো এক অভিনব প্রতিবাদের মাধ্যমে। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে সরকারের ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সামনে ব্যানার ও পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে প্রায় ৩০টি রোবটকে।

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবটের পাশাপাশি ছিল চার পায়ের রোবট কুকুরও। নির্দিষ্টভাবে সাজানো সারিতে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তারা গোল হয়ে হাঁটে, পতাকা ওড়ায় এবং লাউডস্পিকারে বিভিন্ন স্লোগান প্রচার করে।

অভিনব এই আয়োজনের মাধ্যমে আয়োজকেরা মূলত একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন, আর তা হলো এআই ও রোবট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাকরি ও কর্মসংস্থানের ওপর যে চাপ তৈরি হতে পারে, সেটি এখনই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

রোবটদের মুখে চাকরি বাঁচানোর দাবি

‘ডেমোক্রেটিজম’ নামের একটি সংগঠন এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের আয়োজন করে। তাদের বক্তব্য, প্রযুক্তির অগ্রগতি ঠেকানো নয়, বরং এআই ও রোবটের ব্যবহার যাতে মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে আগেই কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রোবটগুলোর মধ্যে ছিল এআই-চালিত হিউম্যানয়েড ‘অ্যাজিবট এ৩’। ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও জবাব দেয় রোবটটি। এ সময় প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরে এটি জানায়, এ ধরনের প্রযুক্তি এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়, বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভ চলাকালে লাউডস্পিকারে প্রচার করা হয় বিভিন্ন বার্তা। এর মধ্যে মানুষের চাকরি রক্ষার পাশাপাশি এআই ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় নিয়ম তৈরির দাবি ছিল অন্যতম।

কেন মানুষের বদলে রোবট?

প্রতিবাদের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল, রোবটেরাই কেন রোবটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছে। আয়োজকদের মতে, এর পেছনে ছিল একটি সচেতন কৌশল। মানুষের বদলে রোবটকে সামনে এনে তারা দেখাতে চেয়েছেন, প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই কতটা উন্নত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে।

আয়োজনটির অন্যতম উদ্যোক্তা গ্রেগর্জ কুলিস বলেন, সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল এ উদ্যোগের বড় উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে আধুনিক রোবটের সক্ষমতা বাস্তবে দেখিয়ে এআই ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করাও ছিল তাদের লক্ষ্য।

তবে সাংবাদিকেরা কুলিসকে প্রশ্ন করেন, কোনো রোবট যদি আগে থেকে ধারণ করা বক্তব্য প্রচার করে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে বিক্ষোভ বলা যায় কি না। এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।

ইউরোপে এআই নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপট

পোল্যান্ডে এই ব্যতিক্রমী কর্মসূচি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি আইন ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে।

২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইনে প্রযুক্তির ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষের জন্য তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম প্রযোজ্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা, নিষিদ্ধ কিছু প্রয়োগ এবং উচ্চঝুঁকির প্রযুক্তির ওপর নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব বিধান তৈরি করা হয়েছে। সদস্য দেশগুলোকে নিজ নিজ পর্যায়েও আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে পোল্যান্ডেও এআই ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশটির প্রেসিডেন্ট একটি এআই-সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন দিয়েছেন। এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার জন্য বিশেষ কমিশন গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব হবে পোল্যান্ডে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন পর্যবেক্ষণ করা। পাশাপাশি ক্ষতিকর বা অনিয়মপূর্ণ এআই ব্যবহারের বিষয়ে অভিযোগ উঠলে সেগুলো পর্যালোচনার দায়িত্বও থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

যে প্রতিষ্ঠানের তৈরি রোবট

পোল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম ওপোলস্কা৩৬০-এর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রোবটগুলো তৈরি করেছে ‘ডেল্টা রোবটস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিউম্যানয়েড রোবট এবং চার পায়ের রোবট কুকুর নিয়ে কাজ করছে।

এই আয়োজনের সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। বিক্ষোভের উদ্যোক্তা গ্রেগর্জ কুলিস ‘উইগ্রি’ নামের একটি কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই দশক ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অর্থাৎ যেসব রোবটের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে, সেই রোবটগুলোর প্রদর্শনীর সঙ্গে একই সময়ে প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

তবে কুলিসের বক্তব্য, তারা রোবট বা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন না। বরং এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের ফলে শ্রমবাজারে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে আগেভাগেই জনমত তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

নিরাপদ এআই ব্যবহারে পোল্যান্ডের উদ্যোগ

বিক্ষোভের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন পোল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী গাওকোভস্কি। তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই বাজার পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে পোল্যান্ড ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

তার বক্তব্যে এআই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ জন্য বিশেষ কমিশনের পাশাপাশি ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো এআই প্রযুক্তি বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সেটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পোল্যান্ডের নতুন আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর লক্ষ্যও একই। বাজারে ক্ষতিকর এআই ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো, প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিয়মের আওতায় আনা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

রোবটদের এই অভিনব বিক্ষোভ তাই শুধু একটি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী নয়। এর মাধ্যমে এআইয়ের দ্রুত বিস্তার, মানুষের কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে, সেগুলোই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G