নবীজির সময় থেকেই আরবদের খাবারের তালিকায় ছিল যে টিকটিকি
মরুভূমির প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক পরিবেশেও অনায়াসে টিকে থাকতে পারে একটি বিশেষ ধরনের টিকটিকি। আরব অঞ্চলে পরিচিত এই প্রাণীটির নাম ‘দব’। কাঁটাযুক্ত লেজের কারণে ইংরেজিতে একে স্পাইনি-টেইলড লিজার্ড বলা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম Uromastyx aegyptia।
তবে দব শুধু মরুভূমির একটি বন্যপ্রাণী নয়। আরব উপদ্বীপের মানুষের পুরোনো লোকজ সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও প্রাণীটির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে দবের মাংস খাওয়ার প্রচলন দেখা যায়।
বেদুইনদের খাদ্যসংস্কৃতিতে দব
আরব মরুভূমির বেদুইনদের জীবনযাত্রায় দবের উপস্থিতি বহু পুরোনো। মরুভূমিতে সহজে পাওয়া যেত বলে অতীতে শিকার করে এই প্রাণী খাওয়া হতো। সময়ের সঙ্গে খাদ্যসংগ্রহের সেই পুরোনো পদ্ধতি বদলে গেলেও কিছু এলাকায় ঐতিহ্য ও স্বাদের কারণে দবের মাংস খাওয়ার রীতি টিকে আছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, দব শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, আরব মরুভূমির মানুষের গল্প, লোককথা ও প্রবাদ-প্রবচনেরও অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে প্রাণীটি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে।
নবীজির যুগেও ছিল দব
দব খাওয়ার বিষয়টি ইসলামী ইতিহাস ও হাদিসেও উল্লেখ রয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একাধিক হাদিসে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজে দবের মাংস খেতেন না। তবে তিনি সাহাবিদের এটি খেতে নিষেধও করেননি।
একটি বর্ণনায় দবের মাংসকে হালাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নবীজি (সা.)-এর ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস এবং কোনো খাবারকে বৈধ বা অবৈধ বলার বিষয়টি এক নয়। দব না খাওয়াকে তিনি নিজের রুচি বা অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বলে হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়।
মাংস ও চর্বি নিয়ে নানা লোকবিশ্বাস
দবের মাংস ও চর্বি ঘিরে বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত বিশ্বাসও রয়েছে। স্থানীয় কিছু মানুষের ধারণা, এর মাংস বা চর্বির বিশেষ কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে।
তবে এসব কথিত ঔষধি গুণের সবগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে, এমন দাবি করা যায় না। ফলে লোকবিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
শিকার কমানো হচ্ছে সংরক্ষণের জন্য
দবের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে প্রাণীটির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অতিরিক্ত শিকার এবং দীর্ঘ সময়ের খরার মতো কারণে সৌদি আরবের কিছু এলাকায় একসময় এর সংখ্যা কমে গিয়েছিল।
Uromastyx aegyptia বর্তমানে প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের তালিকায় ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় বন্য পরিবেশে প্রাণীটির টিকে থাকা নিশ্চিত করতে শিকার নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবে সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে বন্যপ্রাণী শিকার নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ফলে বহু পুরোনো খাদ্যসংস্কৃতির অংশ এই মরুভূমির প্রাণীটিকে ঘিরে এখন ঐতিহ্যের পাশাপাশি সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
দব তাই আরব মরুভূমির আরেকটি সাধারণ প্রাণীর নামের চেয়ে বেশি কিছু। এটি একদিকে মরুভূমির কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ উদাহরণ, অন্যদিকে আরবদের পুরোনো খাদ্যাভ্যাস, লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা একটি প্রাণী।
প্রতি / এডি / শাআ























