১ হাজার টাকার নোট বাতিলের দাবিতে আইনি নোটিশ
পর্যাপ্ত রিজার্ভের সমর্থন ছাড়া কাগুজে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানো বন্ধ এবং এক হাজার টাকার নোট বাতিলের দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা ও অবৈধ অর্থের বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নোটিশটি পাঠান। এতে দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জবাব বা কার্যকর ব্যবস্থা না হলে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট আবেদন করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
নোটিশে সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে নাগরিকের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশদাতা আইনজীবীর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, জনসম্পদ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুরক্ষার উদ্দেশ্যেই তিনি এই আইনি উদ্যোগ নিয়েছেন।
কাগুজে মুদ্রা নিয়ে যে দাবি
নোটিশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, বাস্তব সম্পদ বা পর্যাপ্ত রিজার্ভের সমর্থন ছাড়াই মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এতে কাগুজে মুদ্রার প্রকৃত মূল্য এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ এবং বাংলাদেশ কয়েনেজ অর্ডার, ১৯৭২-এর আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা-সংক্রান্ত ক্ষমতার প্রসঙ্গও এতে আনা হয়েছে। নোটিশদাতার বক্তব্য, মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা সীমাহীন নয় এবং মুদ্রার পেছনে স্বর্ণ, রৌপ্য কিংবা মার্কিন ডলার, ইউরো ও চীনা ইউয়ানের মতো রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা প্রয়োজন।
এক হাজার টাকার নোট নিয়ে অভিযোগ
এক হাজার টাকার নোটের ব্যবহার নিয়েও নোটিশে নানা দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন লেনদেনে এই উচ্চ মূল্যমানের নোটের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
নোটিশদাতার অভিযোগ, এই নোট অবৈধ সম্পদ ও অপ্রদর্শিত অর্থ জমিয়ে রাখা বা গোপন করার ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে পারে। এর মাধ্যমে কর ফাঁকি এবং অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থনীতির বিস্তার ঘটার আশঙ্কার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
উচ্চ মূল্যমানের নোট প্রত্যাহারকে অবৈধ অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে নোটিশে ভারতের দুই হাজার রুপির নোট প্রত্যাহারের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে দুই হাজার রুপির নোট প্রত্যাহারের সময় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটিকে ‘ক্লিন নোট পলিসি’র অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল এবং নোটটি তখনও বৈধ মুদ্রা হিসেবে বহাল ছিল।
মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ
নোটিশে আরও দাবি করা হয়েছে, উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে বা পর্যাপ্ত রিজার্ভ সমর্থন ছাড়া মুদ্রার সরবরাহ কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হলে টাকার প্রকৃত মূল্য ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ‘কোয়ান্টিটি থিওরি অব মানি’র উল্লেখ করে জার্মানির ওয়েইমার প্রজাতন্ত্র, জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টানা হয়েছে। নোটিশদাতার বক্তব্য, এ ধরনের মুদ্রা সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি বা হাইপারইনফ্লেশনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এতে আরও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়তে পারে। নোটিশে বিষয়টিকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
নোটিশে শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত রিজার্ভ সমর্থন ছাড়া নতুন কাগুজে মুদ্রা ছাপানো বন্ধ এবং এক হাজার টাকার নোট বাতিল বা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ না হলে হাইকোর্টে রিট করার কথা জানিয়েছেন আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন।
প্রতি / এডি / শাআ























