যেভাবে ভারত ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠছে
ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বর্তমান কাঠামো নিয়ে বিরোধী দল, আইনজীবী ও বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তিনি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে দেশের ২৬তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন।
সমালোচকদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাদের কেউ কেউ এসব ঘটনাকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়ার বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখছেন।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ, বিশেষ করে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, ব্যাপক পরিসরে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের ফলে বৈধ ভোটারদের একটি অংশ তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন ভোটারদের নিবন্ধন এবং বিদ্যমান ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী নেতারা।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করা এবং যোগ্য নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই এসআইআরের উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালে বিহারে এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে কমিশন জানিয়েছিল, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে পরিচালিত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বুথ লেভেল এজেন্টদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তাই ভোটার বাদ পড়ার সংখ্যা, প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যে অভিযোগগুলো রয়েছে, সেগুলো এখনো বিতর্ক ও বিচারিক পর্যালোচনার বিষয়।
জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা
বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্যের সম্মতি ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা গৃহীত হয়। মামলাকারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ যৌথভাবে হওয়ার কথা। কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারিত আইন ও প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হয়েছে।
৫ অক্টোবর ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্ট জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একটি নোটিসও জারি করেছে। মামলাটিতে এসআইআর-সংক্রান্ত প্রায় ১৪টি সিদ্ধান্ত অন্য দুই কমিশনারের সম্মতি ছাড়া নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। আদালত অবশ্য এই পর্যায়ে তাঁকে সাময়িকভাবে পদ থেকে সরানোর আবেদন গ্রহণ করেনি।
ফলে বিষয়টি এখন সরাসরি বিচারিক পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন নিয়েও বিতর্ক
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো কমিশনারদের নিয়োগ পদ্ধতি।
২০২৩ সালে সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি নির্ধারণ করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা থাকেন।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনার পর গঠিত ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতি ছিলেন বাছাই কমিটির সদস্য। নতুন আইনে প্রধান বিচারপতির জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে।
সমালোচকদের যুক্তি, এতে সরকারের হাতে বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়ে। এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতাই এখন সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ এ বিষয়ে ভিন্নমতে পৌঁছায় এবং বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়, যাতে প্রয়োজন হলে বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে শুনানি হতে পারে।
কেন ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি আলোচনায়?
ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে কিছু লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। তাদের যুক্তি, যখন নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান, ভোটার তালিকা, প্রশাসন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তখন সেটিকে শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না।
সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর পড়ে।
তবে ভারত ফ্যাসিবাদে প্রবেশ করেছে কি না, সেটি একটি রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক মূল্যায়ন। এটিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের বদলে সংশ্লিষ্ট লেখক, রাজনৈতিক দল বা বিশ্লেষকদের মতামত হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
ভোটার বাদ পড়ার অভিযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার যাতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, যাচাইয়ের কঠোর প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, প্রান্তিক বা নথিপত্রের সমস্যায় থাকা মানুষদের ভোটাধিকার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হলো, ভোটার তালিকায় প্রকৃত ও যোগ্য নাগরিকদের নাম নিশ্চিত করাই সংশোধন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। কমিশন ২০২৫ সালে বিহারের এসআইআর নিয়ে জানিয়েছিল, যোগ্য নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আস্থার
ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর। তাই কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের আস্থা কমে গেলে বিষয়টি আর কেবল একটি প্রশাসনিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বর্তমানে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্ব, এসআইআর কার্যক্রম এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ পদ্ধতি, তিনটি বিষয়ই বিচারিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে থাকা মামলাগুলোর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কমিশনার নিয়োগের কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কে এখন আদালতের পর্যবেক্ষণও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ























