রোগীর পথ্যেও বাড়ছে খরচ, নাগালের বাইরে মাল্টা-কমলা

প্রকাশঃ অক্টোবর ৫, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৫২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

ডেঙ্গু রোগীর পাশে এক বাটি মাল্টা বা কমলা, এমন দৃশ্য একসময় খুবই পরিচিত ছিল। অসুস্থ মানুষের পথ্য হিসেবে এসব ফল নিয়মিতই কিনতেন স্বজনরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ফল কিনতেও এখন অনেক পরিবারকে বাড়তি খরচের হিসাব করতে হচ্ছে।

রাজধানীর বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫২০ টাকায়। কমলার দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে কেজিপ্রতি ৬০০ টাকায়। শুধু মাল্টা ও কমলা নয়, আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ আমদানিনির্ভর অন্যান্য ফলের দামও বেশ চড়া। ফলে রোগীর পথ্য কিংবা পরিবারের নিয়মিত পুষ্টির অংশ হিসেবে যে ফলগুলো আগে সহজেই কেনা হতো, সেগুলো এখন অনেকের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ফলের দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আমদানি কমে যাওয়া, উচ্চ শুল্ক ও কর, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়া, বন্দর ও পরিবহণ ব্যয় এবং বাজারে সরবরাহ ঘাটতি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি আমদানি ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগও রয়েছে।

সরবরাহ বাড়াতে এলসি খোলার তাগিদ

বাজারে বিদেশি ফলের সরবরাহ বাড়াতে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র বা এলসি খোলার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

শনিবার সচিবালয়ে ফল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৫২০ টাকা হওয়ার কারণ জানতে চান তিনি। বাজারে অস্বাভাবিক দামে ফল বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

একই সঙ্গে মাল্টার বর্তমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

পাঁচ সপ্তাহেই মাল্টার দাম বেড়েছে ৮৬ শতাংশ

বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ফলের দাম বাড়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে, আগস্টের শেষ দিকে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২৮০ টাকায়। একই সময়ে কমলার কেজি ছিল প্রায় ৩৫০ টাকা।

বর্তমানে মাল্টার দাম ৫২০ টাকা হওয়ায় পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ২৪০ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে কমলার দাম বেড়েছে ২৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৭১ শতাংশ।

এদিকে খেজুরের আমদানি শুল্ক ও কর নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানোর কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

বিভিন্ন ধরনের খেজুরের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ও গ্রেড যাচাই করে একটি যৌক্তিক নির্দেশক অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করবে। পরে তাদের প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো হবে।

সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিক শুল্কায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, আবার পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে কেউ যাতে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ না পান।

দেশি ফলের দামও কম নয়

শুধু বিদেশি ফল নয়, রাজধানীর বাজারে দেশি ফলের দামও এখন তুলনামূলকভাবে বেশি। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি ড্রাগন ফল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, পেয়ারা ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং সাগরকলা প্রতি ডজন ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া জাম্বুরার দাম আকার ও মানভেদে প্রতি পিস ৮০ থেকে ১২০ টাকা। আমড়ার কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৯০ টাকায়।

চাহিদা বাড়লেও কমছে সরবরাহ

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে কোনো কোনো সপ্তাহে মাল্টা এসেছে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনই প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন।

ফলে সরবরাহের সঙ্গে চাহিদার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ফলের চাহিদা বাড়ায় বাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

আগস্ট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। হাসপাতালকেন্দ্রিক বাজারেও এ সময় মাল্টা ও কমলার চাহিদা বেড়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় বাড়তি চাহিদার সামান্য চাপও ফলের দামে বড় প্রভাব ফেলছে।

উচ্চ শুল্কের প্রভাব পড়ছে ভোক্তার ওপর

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমদানি করা ফলকে অনেক সময় বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে এসব ফল আমদানিতে তুলনামূলক বেশি কর ও শুল্ক দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।

তার সংগঠনের পক্ষ থেকে ফলের ওপর আরোপিত সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।

বৈঠকে ছিলেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারাও

ফলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠকে অংশ নেন।

ফলের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানি ব্যয় ও শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা এবং বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G