ইতিহাসের পাতায় অমর এক নাম, বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান
কোনো মানুষের পরিচয় কি তাঁর মৃত্যুর পর কোথায় সমাহিত হলেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হয়? নাকি তাঁর পরিচয় তৈরি হয় দেশ, মানুষ আর স্বাধীনতার জন্য তিনি কী রেখে গেলেন, তা দিয়ে? বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের জীবনের দিকে তাকালে এমন প্রশ্ন বারবার সামনে আসে।
একসময় পাকিস্তানের করাচিতে তাঁর কবরের সামনে লেখা হয়েছিল ‘গাদ্দার’, অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতক। অথচ সেই মানুষটিই নিজের জীবন বাজি রেখে একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের মাটিতে দীর্ঘ ৩৫ বছর পড়ে ছিল তাঁর দেহাবশেষ। অবশেষে ২০০৬ সালে ফিরে এসেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছেন, সেই দেশেই আবার সমাহিত হন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়।
এ শুধু একজন বীরের জীবনকাহিনি নয়, এ আমাদের স্বাধীনতার প্রতি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর সাহসের এক অসাধারণ ইতিহাস।
যে স্বপ্নের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন
১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডের ‘মোবারক লজে’ জন্মগ্রহণ করেন মতিউর রহমান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার। সেই স্বপ্ন তাঁকে নিয়ে যায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ একাডেমিতে। দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে একসময় তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রশিক্ষক পাইলট।
১৯৭১ সালে যখন পূর্ব বাংলায় শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, তখন মতিউর রহমান কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। ছুটিতে দেশে এসে তিনি মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন ও প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত হন। নরসিংদীর রায়পুরা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার উদ্যোগও নেন।
কিন্তু তাঁর মনে ছিল আরও বড় একটি পরিকল্পনা। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবেন। সেই বিমান কাজে লাগবে স্বাধীনতার লড়াইয়ে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছিল পাকিস্তানে। সেখানে চাকরিতে যোগ দিলেও তাঁর ভেতরে চলছিল অন্য এক প্রস্তুতি। প্রতিটি দিন ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বাঙালি কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছিল।
একটি টি-৩৩ বিমান, স্বাধীনতার স্বপ্ন আর শেষ লড়াই
১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট। করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটি। সেদিন নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পাকিস্তানি পাইলট রশিদ মিনহাজ।
এই সুযোগটির অপেক্ষাতেই ছিলেন মতিউর রহমান।
বিমানের কাছে গিয়ে তিনি রশিদ মিনহাজকে থামার সংকেত দেন। এরপর তাঁকে অচেতন করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিকল্পনা ছিল বিমানটি নিয়ে ভারতের দিকে চলে যাওয়া এবং সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া।
কিন্তু ঘটনাটি গোপন থাকেনি। রশিদ মিনহাজ নিয়ন্ত্রণকক্ষে বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন যে বিমানটি ছিনতাই করা হয়েছে। এরপর পাকিস্তান বিমানবাহিনী একটি এফ-৮৬ জঙ্গিবিমান ও একটি হেলিকপ্টার দিয়ে বিমানটির পিছু নেয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
মতিউর রহমান বিমানটিকে নিচু দিয়ে উড়িয়ে রাডার এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই রশিদ মিনহাজের জ্ঞান ফিরে আসে। বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত টি-৩৩ বিমানটি পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের থাট্টা এলাকার কাছে বিধ্বস্ত হয়। প্রাণ হারান দুজনই।
মাত্র ২৯ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় মতিউর রহমানের জীবন। তবে তাঁর সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন, দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের আকাঙ্ক্ষা আজও বাঙালির ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
যে কবরের সামনে লেখা হয়েছিল ‘গাদ্দার’
মৃত্যুর পর মতিউর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, তাঁর কবরের সামনে ‘গাদ্দার’ বা বিশ্বাসঘাতক লেখা হয়েছিল।
ভাবতে অবাক লাগে, যে মানুষটি নিজের জন্মভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন, অন্য দেশের মাটিতে তাঁকেই পরিচিত করা হয়েছিল বিশ্বাসঘাতক হিসেবে।
কিন্তু ইতিহাসের বিচারে তিনি বিশ্বাসঘাতক নন। তিনি বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজন। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ২৫ জুন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, অবশেষে তাঁর ঠিকানা হয় সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি।
স্বাধীনতার গল্প শুধু মতিউর রহমানের নয়
মতিউর রহমান একা নন। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন অসংখ্য মানুষের নাম ছড়িয়ে আছে, যাঁদের সাহসিকতা আজও অবিশ্বাস্য মনে হয়।
মনে পড়ে বীর বিক্রম হাবিবুর রহমানের কথা। মুক্তিযুদ্ধে যিনি পরিচিত হয়েছিলেন ‘জাহাজমারা হাবিব’ নামে। ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের কাছে মাটিকাটা এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর এই কমান্ডারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদবাহী দুটি জাহাজে আক্রমণ করেন। জাহাজ দুটি ছিল ‘এস ইউ ইঞ্জিনিয়ার্স এলসি-৩’ এবং ‘এসটি রাজন’। অভিযানে জাহাজ দুটির অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে জাহাজ দুটি ধ্বংস করা হয়। সেই অভিযানের পরই হাবিবুর রহমানের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘জাহাজমারা’ পরিচয়।
আবার মনে পড়ে ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুনের কথা। ১৯৭১ সালের ৯ জুন ঢাকার তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে ঘিরে চালানো হয় তাদের সাহসী গেরিলা অভিযান।
সেদিন বিদেশি অতিথি ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সামনে পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ঢাকায় যে যুদ্ধ চলছে, সেই বাস্তবতা তুলে ধরাই ছিল অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা হোটেলের প্রবেশপথের কাছে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ঢাকা আর তাদের নিরাপদ নিয়ন্ত্রণে নেই।
অভিযানের খবর শুনে মেজর খালেদ মোশাররফ নাকি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল!’ সেই মন্তব্য থেকেই দলটির নাম হয়ে যায় ক্র্যাক প্লাটুন।
এমন কত গল্প ছড়িয়ে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে! কোথাও একজন পাইলটের অসমাপ্ত স্বপ্ন, কোথাও নদীর বুকে অস্ত্রবাহী জাহাজ ধ্বংসের অভিযান, আবার কোথাও শহরের প্রাণকেন্দ্রে জীবন বাজি রেখে চালানো গেরিলা আক্রমণ।
দেশপ্রেম কি এখন পুরোনো হয়ে যাচ্ছে?
আজ আমরা নিজেদের আধুনিক বলি, স্মার্ট বলি, কুল ডুড ভাবতে ভালোবাসি। কিন্তু নিজের দেশের ইতিহাস জানা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করা কিংবা জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া কি আধুনিকতার বাইরে?
সিনেপ্লেক্সে জাতীয় সংগীত বাজলে শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়ানো কোনো সেকেলে আচরণ নয়। বরং যাঁরা এই দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি এটুকু সম্মান দেখানো আমাদের ন্যূনতম দায়িত্ব।
জাতীয় সংগীতের সময় কেউ দাঁড়ালে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুচ্ছ করে দেখা কিংবা বীরশ্রেষ্ঠদের আত্মত্যাগকে ভুলে যাওয়া কোনো স্মার্টনেস হতে পারে না।
আমরা হয়তো তাঁদের মতো সাহসী নই। আমাদের সামনে হয়তো যুদ্ধক্ষেত্র নেই, শত্রুর গুলির সামনে দাঁড়াতে হয় না। কিন্তু তাঁদের ইতিহাস মনে রাখা, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাধীনতার মূল্য বোঝার দায়িত্ব তো আমাদেরই।
শেষ কথা
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্ম হয়েছিল ২৯ অক্টোবর ১৯৪১ সালে। তাঁর জন্মদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, রক্ত, ত্যাগ আর অসমাপ্ত জীবনের গল্প।
তিনি টি-৩৩ বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। জানতেন, এই সিদ্ধান্তের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তারপরও পিছিয়ে যাননি।
হয়তো তিনি জানতেন না, তাঁর সেই যাত্রা সফল হবে কি না। হয়তো জানতেন না, কোনো দিন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে তাঁর কবর হবে। কিন্তু তিনি জানতেন, নিজের দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে।
আজ তাঁর জন্মদিনে কিংবা বছরের যেকোনো দিনে তাঁকে স্মরণ করার জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু তাঁর গল্পটা জানা, তাঁর আত্মত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করা।
আমরা কুল ডুড কি না, স্মার্ট কি না, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই, এই স্বাধীন দেশের আকাশে আজ যে পতাকা উড়ে, তার পেছনে মতিউর রহমানের মতো অসংখ্য মানুষের রক্ত মিশে আছে।
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা, বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান।
আপনার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ আজও আপনার আত্মত্যাগের কাছে ঋণী।
প্রতি / এডি / শাআ



















