একই পথে দেখা মিলবে সবুজ পাহাড়, বরফ আর বিস্তীর্ণ মরুভূমির!

প্রকাশঃ নভেম্বর ৮, ২০২৬ সময়ঃ ৮:১৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:১৪ অপরাহ্ণ

ভারতের হিমাচল প্রদেশের হামতা পাস হিমালয়ের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেকিং গন্তব্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উঁচু এই গিরিপথ কুলু উপত্যকার সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে লাহুল অঞ্চলের শুষ্ক ও পাথুরে ভূপ্রকৃতির সংযোগ ঘটিয়েছে। কয়েক দিনের এই অভিযানে একের পর এক বদলে যায় প্রকৃতির দৃশ্যপট। কোথাও ঘন বন, কোথাও ফুলে ঢাকা তৃণভূমি, আবার কোথাও বরফে আচ্ছাদিত পাহাড় ও মরুভূমির মতো বিস্তীর্ণ প্রান্তর। তবে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে পাড়ি দিতে হয় বেশ কঠিন পথ।

মানালি থেকে শুরু হয় হামতা পাসের যাত্রা। প্রথমে জোবরার বনাঞ্চল অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় চিক্কা ও বালু কা ঘেরা এলাকায়। বিস্তীর্ণ ঘাসের মাঠ আর পাহাড়ি পরিবেশ পেরিয়ে সামনে এগোলে পথ ক্রমেই দুর্গম হয়ে ওঠে। এরপর বরফে ঢাকা ঢাল ও পাথুরে পথ ধরে পৌঁছাতে হয় শিয়া গোরুর উঁচু তৃণভূমিতে। পুরো যাত্রায় প্রতিটি নতুন জায়গায় প্রকৃতির ভিন্ন রূপ চোখে পড়ে।

সবুজ বন থেকে বরফের রাজ্যে

হামতা পাসের যাত্রার শুরুতেই ট্রেকারদের দেখা মেলে কুলু উপত্যকার মনোরম প্রকৃতির। দেওদার, ওক ও পাইনগাছে ঘেরা পাহাড়ি পথের দুই পাশে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের মাঠ। কোথাও ছোট জলধারা, কোথাও কাঠের সেতু, আবার কোথাও নানা রঙের বুনো ফুলে সাজানো পাহাড়ি ঢাল। নির্মল বাতাস আর চারপাশের নৈসর্গিক পরিবেশে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে অন্য রকম।

তবে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পথের ধরন। গিরিপথের দিকে এগোতে গেলে পাড়ি দিতে হয় খাড়া পাহাড়ি ঢাল, বরফে ঢাকা সরু রাস্তা এবং পাথুরে পথ। একসময় পেছনে পড়ে থাকে সবুজ উপত্যকা। চারদিকে তখন বরফে মোড়া পাহাড় আর বিশাল হিমালয় পর্বতমালার দৃশ্য।

হামতা পাস অতিক্রম করে স্পিতি উপত্যকার দিকে নামার সময় প্রকৃতিতে আবারও পরিবর্তন আসে। সবুজ গাছপালার বদলে সামনে দেখা যায় শুষ্ক পাহাড়, পাথুরে ঢাল ও ধূসর প্রান্তর। মরুভূমির মতো এই পরিবেশের রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। একই অভিযানে এত বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি দেখার সুযোগই হামতা পাসকে অন্য ট্রেকিং রুট থেকে আলাদা করেছে।

দুর্গম পথের সঙ্গে লড়াই

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি হামতা পাস ট্রেকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কঠিন পথ। যত ওপরে ওঠা যায়, বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব তত কমতে থাকে। এতে শ্বাস নিতে কষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা উচ্চতাজনিত অসুস্থতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এ কারণে তাড়াহুড়া না করে ধীরে ধীরে এগোনো এবং শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া প্রয়োজন।

গ্রীষ্মকালেও ট্রেকের বিভিন্ন অংশে বরফ জমে থাকতে পারে। কোথাও পিচ্ছিল ঢাল, কোথাও সরু পাহাড়ি পথ, আবার কোথাও বড় পাথর ও নুড়িপাথর পেরিয়ে এগোতে হয়। বরফগলা পানির ঠান্ডা জলধারা পার হওয়াও বেশ চ্যালেঞ্জিং। তাই যাত্রার আগে ভালো মানের ট্রেকিং জুতো, উপযুক্ত পোশাক এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা জরুরি।

পাহাড়জুড়ে উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য

হামতা পাস শুধু পাহাড় ও বরফের দৃশ্যের জন্য নয়, এখানকার জীববৈচিত্র্যের জন্যও আকর্ষণীয়। নিচু এলাকার সবুজ ঢালে দেখা যায় নানা ধরনের পাহাড়ি ফুল ও গাছপালা। এর মধ্যে রয়েছে রডোডেনড্রন, অর্কিড এবং হিমালয়ের নীল পপির মতো ফুল। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালার ধরনও পরিবর্তিত হয়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট গুল্ম ও শ্যাওলা তখন বেশি চোখে পড়ে।

বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগও রয়েছে এই পথে। ভাগ্য ভালো হলে হিমালয়ান শিয়াল, মারমট কিংবা নীল ভেড়া বা ভরলের দেখা পাওয়া যেতে পারে। পাহাড়ের খাড়া পাথুরে ঢালে চলাফেরা করতে দেখা যায় এসব প্রাণীকে। কখনো বরফের ওপর তুষারচিতার পায়ের ছাপও নজরে আসতে পারে।

এ ছাড়া পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির ধারা, নির্জন উপত্যকা এবং পাথুরে পাহাড়ের বিস্তীর্ণ দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।

অভিযানের বাড়তি আকর্ষণ চন্দ্রতাল হ্রদ

হামতা পাস ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ চন্দ্রতাল হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদের নামের অর্থ চাঁদের হ্রদ। হিন্দু পুরাণেও এই জলাশয়ের উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দেবরাজ ইন্দ্রের রথ এই হ্রদের কাছেই এসে থেমেছিল।

চন্দ্রতালের সৌন্দর্যের বিশেষত্ব হলো, দিনের আলো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর পানির রংও বদলে যেতে দেখা যায়। কখনো গাঢ় নীল, আবার কখনো পান্নার মতো সবুজ আভা ছড়িয়ে পড়ে পানিতে। চারপাশের বরফে ঢাকা পাহাড়ের প্রতিবিম্ব স্বচ্ছ হ্রদের জলে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছানোর পর এমন পরিবেশে সময় কাটানো ট্রেকারদের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা। দিনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি রাতে আকাশভরা তারার দৃশ্যও মুগ্ধ করে পর্যটকদের। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ মেলে এখানে।

কোন সময়ে যাবেন, কী প্রস্তুতি নেবেন?

সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামতা পাস ট্রেকের উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় পাহাড়ের তৃণভূমি সবুজ হয়ে ওঠে, বিভিন্ন ধরনের ফুল ফোটে এবং বরফ গলতে শুরু করে। তবে বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে পথ পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় প্রয়োজন হয় বাড়তি সতর্কতার।

এই ট্রেকে যাওয়ার আগে নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করা ভালো। যাত্রার আগে আবহাওয়ার অবস্থা জেনে নেওয়া এবং অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চতাজনিত অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

হিমালয়ের এক যাত্রায় সবুজ বন, বরফে ঢাকা পাহাড় এবং শুষ্ক মরুভূমির মতো ভূপ্রকৃতি দেখার অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে হামতা পাস হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে এর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি দুর্গম পথ ও উচ্চতার ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েই অভিযানে বের হওয়া উচিত।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G