পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় ইরান থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো

প্রকাশঃ নভেম্বর ৮, ২০২৬ সময়ঃ ৮:০৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:০৬ অপরাহ্ণ

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ও নতুন করে হামলার আশঙ্কায় দেশটিতে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের দ্রুত চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। একই সঙ্গে কয়েকটি দেশ তাদের কূটনৈতিক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এমন সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

এদিকে সম্ভাব্য হামলা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা নির্দেশনা জারির খবরও সামনে এসেছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সীমিত হামলার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

গত সোমবার রাতে ইরানের কেশম দ্বীপে কয়েক দফা বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। পরে মার্কিন কর্মকর্তারা দ্বীপটিতে সীমিত সামরিক হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে মার্কিন সম্পদের জন্য হুমকি তৈরি হওয়ায় প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়।

এর আগে ইরানের মাউন্ট কোলাংসহ একাধিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন।

মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেশম দ্বীপে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ইরান একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছিল। সেটি কার্যকর হওয়ার আগেই মার্কিন বাহিনী সফলভাবে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প এই অভিযানকে সীমিত পরিসরের হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ঘিরে নতুন উদ্বেগ

ইরানের মধ্যাঞ্চলে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামলার হুঁশিয়ারির পর এই পাহাড়ের নিচে থাকা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গালফ নিউজ, দ্য সানডে টাইমস ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড়টির নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি স্থাপনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর কিছু অংশ গ্রানাইট পাথরের প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে নির্মিত। এ কারণে প্রচলিত শক্তিশালী বাংকার বিধ্বংসী বোমা দিয়েও স্থাপনাটি ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে।

তবে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটির প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকেরা সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাননি। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতেও ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কাজ কিংবা পারমাণবিক উপাদান সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইরানের দাবি, ২০২০ সালে নাতাঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কারখানার বিকল্প হিসেবে স্থাপনাটি তৈরি করা হচ্ছে।

এর আগে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে বড় ধরনের হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহেও তিনি ইরানের এক বা দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

যেসব দেশ নাগরিকদের ইরান ছাড়তে বলেছে

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জার্মানি, ভারত, পোল্যান্ড, সার্বিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশ ইরানে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে।

ইতালি পর্যটন কিংবা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ইরানে অবস্থানরত নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য সাময়িকভাবে দেশটি থেকে নিজেদের কূটনৈতিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, দূর থেকে দূতাবাসের কার্যক্রম চালানো হবে। ফলে সরাসরি কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে না।

কানাডা নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ থাকলে নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির সরকারের আশঙ্কা, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া সরকারও নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব ইরান ছাড়তে বলেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও লেবাননে অবস্থানরত অস্ট্রেলীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও কাতারে থাকা কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।

চীন তার নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ফ্লাইট কিংবা স্থলপথে অন্য দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইরানে অবস্থানরত নাগরিকদের নিরাপত্তা সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জার্মান দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরানসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যেকোনো সময় আকাশপথে চলাচলে বিধিনিষেধ, ফ্লাইট বাতিল কিংবা আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

ভারতও ইরানে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীসহ সব নাগরিককে সতর্ক থাকার এবং সুযোগ থাকলে দ্রুত দেশটি ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ইরানে অবস্থানরত নিজ দেশের নাগরিকদের অবিলম্বে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সংঘাতের আশঙ্কা বাস্তব এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

এ ছাড়া সার্বিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনারগার্ড দেশটিতে অবস্থানরত সুইডিশ নাগরিকদের অবিলম্বে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশের এমন সতর্কতাকে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা এবং সম্ভাব্য পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কায় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G