রান্নাঘরের স্পঞ্জ ও মাজুনি থেকে হতে পারে ক্যানসার, যা বলছে গবেষণা
রান্নাঘরে থালাবাসন পরিষ্কারের কাজে স্পঞ্জ ও ধাতব মাজুনি ব্যবহার করেন অনেকেই। হাঁড়ি-পাতিলের তেল-চর্বি, পোড়া দাগ কিংবা জমে থাকা ময়লা দূর করতে এসব সরঞ্জামের বিকল্প নেই বললেই চলে। কিন্তু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগজনক একটি দাবি। বলা হচ্ছে, বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ ও ধাতব মাজুনি ব্যবহারের কারণে ক্যানসার হতে পারে।
প্রতিদিন খাবারের থালাবাসন পরিষ্কারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম থেকেই যদি ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। তবে এ দাবির পেছনে কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত রান্নাঘরের স্পঞ্জে বিপুল পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে। আবার কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ ব্যবহারের সময় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও ছড়াতে পারে। তবে এসব গবেষণার কোনোটিই প্রমাণ করেনি যে সাধারণভাবে স্পঞ্জ বা ধাতব মাজুনি ব্যবহার করলে ক্যানসার হয়।
স্পঞ্জ ব্যবহারে ক্যানসারের আশঙ্কা কতটা?
গত ১৫ এপ্রিল ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে মতামত দিয়েছেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ কোটাবাগি। তিনি ভারতের গ্রেটার নয়ডার একটি হাসপাতালের সার্জিক্যাল অনকোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রান্নাঘরের স্পঞ্জের গঠন অনেকটা ছিদ্রযুক্ত এবং এটি দীর্ঘ সময় আর্দ্র থাকে। ফলে স্পঞ্জের ভেতরে ও গায়ে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু জমার সুযোগ তৈরি হয়। নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং দীর্ঘদিন একই স্পঞ্জ ব্যবহার করলে সেখানে জীবাণুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তবে সাধারণ রান্নাঘরের স্পঞ্জ ব্যবহারের সঙ্গে ক্যানসার হওয়ার সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিষ্কার স্পঞ্জের কারণে বরং খাবার ও রান্নাঘরের অন্যান্য সরঞ্জামে ক্ষতিকর জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। এর ফলে খাদ্যবাহিত অসুস্থতা বা সংক্রমণ হতে পারে।
তাই স্পঞ্জ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্যানসারের আশঙ্কা এবং জীবাণুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যবহৃত স্পঞ্জে মিলেছে যেসব ব্যাকটেরিয়া
রান্নাঘরের স্পঞ্জে জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ে ২০২২ সালে ‘জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। নরওয়ে ও পর্তুগালের গবেষকেরা এ গবেষণায় ব্যবহৃত বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ ও ব্রাশ পরীক্ষা করেন।
পরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যবহৃত স্পঞ্জে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এর মধ্যে অ্যাসিনেটোব্যাকটার ও সিউডোমোনাসের মতো ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও পাওয়া যায়। তবে স্পঞ্জে এসব ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেলেই সবগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
গবেষণায় স্পঞ্জের পাশাপাশি বাসন ধোয়ার ব্রাশের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, স্পঞ্জের তুলনায় ব্রাশে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কম থাকে।
এর একটি কারণ হলো, ব্যবহারের পর ব্রাশ তুলনামূলক দ্রুত শুকিয়ে যায়। ফলে সালমোনেলার মতো কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সেখানে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সুযোগ কম পায়।
তবে গবেষণাটিতে ধাতব মাজুনি পরীক্ষা করা হয়নি। তাই ব্রাশের ক্ষেত্রে পাওয়া ফলাফল সরাসরি ধাতব মাজুনির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
স্পঞ্জ থেকে কি ছড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক?
স্পঞ্জ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। সেটি হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ ব্যবহারের সময় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা নির্গত করতে পারে। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা স্পঞ্জের ঘর্ষণ ও ক্ষয়ের ফলে এসব কণা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি পরীক্ষা করেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। পরিবেশের বিভিন্ন মাধ্যমে এসব কণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষের শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন।
তবে স্পঞ্জ থেকে নির্গত কণার কতটা বাসনের মাধ্যমে খাবারে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। একইভাবে এসব কণার কারণে ক্যানসার হয়, এমন প্রমাণও ওই গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে ইউরোপীয় খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের জন্য তৈরি একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘর্ষণের ফলে খাবারের সংস্পর্শে থাকা বিভিন্ন উপকরণ থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বের হতে পারে। তবে মানুষের শরীরে এর প্রকৃত সংস্পর্শের মাত্রা নির্ধারণের মতো তথ্য এখনো সীমিত।
অর্থাৎ মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা চললেও রান্নাঘরের স্পঞ্জকে ক্যানসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ধাতব মাজুনি ব্যবহারে কী ধরনের বিপদ হতে পারে?
বাংলাদেশের রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিল পরিষ্কারের জন্য স্টিলের তার বা ধাতব তন্তু দিয়ে তৈরি মাজুনির ব্যবহার বেশ প্রচলিত। বিশেষ করে পোড়া খাবারের দাগ, শক্ত ময়লা কিংবা জমে থাকা তেল-চর্বি দূর করতে অনেকে এটি ব্যবহার করেন।
তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ধাতব মাজুনির সরু তন্তু দুর্বল হয়ে ছিঁড়ে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ঘষলেও ছোট ছোট ধাতব অংশ খুলে আসার আশঙ্কা থাকে।
এসব তন্তু ভালোভাবে পরিষ্কার না করা বাসনে লেগে থাকলে খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে মুখ, গলা কিংবা পরিপাকতন্ত্রে আঘাত লাগার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ ধরনের শারীরিক আঘাতকে ক্যানসারের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
ধাতব মাজুনি ব্যবহারের কারণে ক্যানসার হয়, এমন সরাসরি ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
এ ক্ষেত্রে মাজুনির উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ। স্টেইনলেস স্টিল, সাধারণ স্টিল কিংবা প্লাস্টিকের আঁশ দিয়ে তৈরি স্ক্রাবারের বৈশিষ্ট্য এক নয়। ফলে সব ধরনের মাজুনির স্বাস্থ্যঝুঁকিও একই রকম হবে না।
অপরিষ্কার স্পঞ্জ থেকে ছড়াতে পারে যেসব সমস্যা
স্পঞ্জের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে কাঁচা মাছ-মাংসের রস, খাবারের অবশিষ্টাংশ কিংবা রান্নাঘরের ময়লা পরিষ্কারের পর একই স্পঞ্জ দিয়ে থালাবাসন ধুলে এক জায়গার জীবাণু অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে খাবার দূষিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিদর্শন বিভাগও রান্নাঘরের স্পঞ্জকে জীবাণুর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। স্পঞ্জের ভেতরে জীবাণু জমে থাকতে পারে এবং এটি পুরোপুরি পরিষ্কার রাখা কঠিন।
গরম করা কিংবা ফুটানোর মতো পদ্ধতিতে স্পঞ্জের জীবাণুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হলেও এসব পদ্ধতিতে সব ধরনের জীবাণু ও দূষণের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
২০২৬ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় রান্নাঘরের ৯৮টি ব্যবহৃত স্পঞ্জ পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, বাইরে থেকে পরিষ্কার মনে হলেও স্পঞ্জের মধ্যে জীবাণু থাকতে পারে।
অর্থাৎ শুধু স্পঞ্জের রং বা বাহ্যিক অবস্থা দেখে সেটি জীবাণুমুক্ত কি না, তা বোঝার উপায় নেই।
স্পঞ্জ ও মাজুনি ব্যবহারে যেসব সতর্কতা জরুরি
রান্নাঘরের এসব সরঞ্জাম ব্যবহারে কিছু সাধারণ অভ্যাস মেনে চললে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমানো যায়।
- বাসন ধোয়ার পর স্পঞ্জ ও মাজুনি পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খাবারের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলুন।
- ব্যবহারের পর স্পঞ্জের অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় শুকাতে দিন।
- সিঙ্কের ভেতরে ভেজা স্পঞ্জ ফেলে রাখবেন না। এতে দীর্ঘ সময় আর্দ্র থাকার কারণে জীবাণু জমতে পারে।
- স্পঞ্জে দুর্গন্ধ, অতিরিক্ত ময়লা কিংবা ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দিলে সেটি পরিবর্তন করুন।
- কাঁচা মাছ-মাংসের রস পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত স্পঞ্জ দিয়ে খাবারের থালাবাসন ধোয়া এড়িয়ে চলুন।
- ধাতব মাজুনির তার বা তন্তু খুলে এলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন।
- বাসন ধোয়ার পর ভালোভাবে পরীক্ষা করুন, কোনো ধাতব তন্তু লেগে আছে কি না।
- ননস্টিক বা সহজে আঁচড় পড়ে এমন পাত্র পরিষ্কারে শক্ত ধাতব মাজুনি ব্যবহার করবেন না।
- সম্ভব হলে দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন বাসন ধোয়ার ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন।
স্পঞ্জ পরিষ্কারের জন্য মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের পরামর্শও বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া হয়। তবে সব ধরনের স্পঞ্জ মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী নয়। বিশেষ করে ধাতব অংশযুক্ত স্পঞ্জ মাইক্রোওয়েভে দিলে বিপদ ঘটতে পারে। তাই স্পঞ্জের ধরন ও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা না জেনে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয়।
তাহলে কি স্পঞ্জ ও মাজুনি ব্যবহার বন্ধ করবেন?
এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণার ভিত্তিতে রান্নাঘরের স্পঞ্জ বা ধাতব মাজুনি ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি।
গবেষণায় স্পঞ্জে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি, কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমন এবং ধাতব মাজুনির তন্তু ক্ষয়ে যাওয়ার বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু এসব তথ্যের কোনোটিই প্রমাণ করে না যে সাধারণ ব্যবহারে স্পঞ্জ বা মাজুনি ক্যানসার সৃষ্টি করে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিতে আতঙ্কিত না হয়ে রান্নাঘরের সরঞ্জাম নিয়মিত পরিষ্কার করা, ব্যবহারের পর শুকিয়ে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রতি / এডি / শাআ























