পরকালে মুমিনের একমাত্র সঙ্গী হবে যে আমল

প্রকাশঃ নভেম্বর ৭, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৫৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৫৯ অপরাহ্ণ

মানুষের দুনিয়ার জীবন নানা ব্যস্ততা ও আয়োজনের মধ্য দিয়ে কাটে। কেউ সম্পদ গড়তে ব্যস্ত, কেউ পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিশ্রম করেন, আবার কেউ সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা অর্জনের পেছনে ছুটে চলেন। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মানুষ কত কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখেন, কত পরিকল্পনা করেন।

কিন্তু জীবনের এই পথচলা যে একদিন থেমে যাবে, তা অনেক সময় আমাদের ভাবনায় আসে না। মৃত্যুর পর নিজের অর্জিত সম্পদ, প্রিয়জন কিংবা পরিচিত পরিবেশের কিছুই সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একাই পাড়ি দিতে হবে পরকালের দীর্ঘ পথ।

তাহলে মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে কী থাকবে? ইসলামের শিক্ষা হলো, দুনিয়ায় করা আমলই হবে পরকালের জীবনে মানুষের প্রকৃত সঙ্গী।

মৃত্যুর পর ফিরে যাবে পরিবার ও সম্পদ

কোনো মানুষের মৃত্যুর খবর পেলে স্বজনেরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে ছুটে আসেন। কান্না, স্মৃতিচারণা আর শোকের মধ্য দিয়ে তাকে বিদায় জানান। এরপর দাফন সম্পন্ন হলে সবাই নিজ নিজ জীবনে ফিরে যান। পড়ে থাকে তার বাড়িঘর, সম্পদ, পরিচিতি ও অসমাপ্ত স্বপ্ন।

মৃত্যুর এই বাস্তবতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো মানুষই মৃত্যুর বাইরে নয়। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান কিংবা সাধারণ মানুষ, প্রত্যেককেই একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।

মানুষের সঙ্গে যাবে যে তিনটি বিষয়

মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে পরিবার, সম্পদ ও আমল- এই তিনটি বিষয় অনুসরণ করে। তবে এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে থেকে যায় কেবল আমল। পরিবার ও সম্পদ দুনিয়াতেই ফিরে আসে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে বলেছেন, ‘মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে তিনটি জিনিস। দুটি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবার, সম্পদ ও আমল তার অনুসরণ করে। অতঃপর তার পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে, আর তার আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫১৪)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, দুনিয়ার জীবনে মানুষ যেসব সম্পদ ও সম্পর্ককে ঘিরে ব্যস্ত থাকে, মৃত্যুর পর সেগুলো আর তার সঙ্গী হয় না। বরং জীবদ্দশায় করা ভালো ও মন্দ কাজের ফল নিয়েই তাকে পরকালের জীবনে প্রবেশ করতে হবে।

ছোট-বড় সব কাজের হিসাব দিতে হবে

দুনিয়ায় অনেক কাজ মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কাজই গোপন থাকে না। মানুষের সামান্য ভালো কাজ যেমন সংরক্ষিত থাকে, তেমনি ছোট কোনো অন্যায়ের হিসাবও বাদ যাবে না।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত: ৭-৮)

তাই শুধু বড় কোনো ইবাদত নয়, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ, সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, অসহায়কে সাহায্য করা এবং অন্যের অধিকার আদায় করাও গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। একইভাবে কারও প্রতি জুলুম করা কিংবা অন্যের হক নষ্ট করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

মৃত্যুর পরও যে তিন আমলের সওয়াব পাওয়া যায়

সাধারণভাবে মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তার আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়। তবে এমন কিছু কাজ রয়েছে, যেগুলোর উপকার ও সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল অব্যাহত থাকে। সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান, যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)

এই হাদিসে তিন ধরনের আমলের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, সদকায়ে জারিয়া বা এমন দান, যার সুফল মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ছড়িয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, উপকারী জ্ঞান, যা অন্যদের কল্যাণে কাজে লাগে। তৃতীয়ত, নেক সন্তান, যে মা-বাবার জন্য দোয়া করে।

অর্থাৎ মানুষের এমন কিছু কাজ রয়েছে, যার কল্যাণ তার মৃত্যুর পরও অন্যদের কাছে পৌঁছাতে পারে।

পরকালের প্রস্তুতিই জীবনের আসল লক্ষ্য

দুনিয়ার জীবনে সম্পদ, সম্মান ও পরিচিতি অর্জনের চেষ্টা করা স্বাভাবিক। তবে এসব অর্জন করতে গিয়ে পরকালের প্রস্তুতি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। একজন মুমিনের জীবনে ইমান, নামাজ, রোজা, সততা, উত্তম চরিত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)

তাকওয়া হলো আল্লাহর প্রতি সচেতন থাকা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এই গুণই মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

পৃথিবীর জীবন সীমিত, কিন্তু পরকালের জীবন অনন্ত। তাই সময় থাকতে নেক আমল করা, মানুষের উপকারে আসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।

মৃত্যুর পর স্বজনেরা ফিরে যাবেন, সম্পদ পড়ে থাকবে, থেমে যাবে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা। তখন মানুষের সঙ্গে থাকবে তার আমল। তাই জীবনের প্রকৃত সফলতা শুধু দুনিয়ায় কী অর্জন করলাম, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরকালের জন্য কতটা উত্তম পাথেয় সংগ্রহ করতে পারলাম, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G