ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিবাসন ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের

প্রকাশঃ অক্টোবর ৭, ২০২৬ সময়ঃ ৮:১৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:১৫ অপরাহ্ণ

অস্ট্রেলিয়ায় পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় যেতে পারলে চার বছরের মধ্যে দেশটিতে অস্থায়ী ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বিরোধী জোট বা কোয়ালিশন। মঙ্গলবার নতুন অভিবাসন নীতি প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর দাবি করেছেন, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ হবে এটি।

বিরোধী জোটের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রথম দুই বছরে নিট অভিবাসন বছরে ১ লাখে নামিয়ে আনা হবে। তৃতীয় বছরে সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার এবং চতুর্থ বছরে ১ লাখ ৬০ হাজারে রাখা হবে।

অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালে নিট অভিবাসনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ১ হাজার। নিট অভিবাসন বলতে নির্দিষ্ট সময়ে দেশে প্রবেশ করা মানুষের সংখ্যা থেকে দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাদ দেওয়ার পর পাওয়া সংখ্যাকে বোঝায়।

শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েটদের ওপর বড় প্রভাব

বিরোধী জোটের প্রস্তাবিত অভিবাসন নীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং সদ্য স্নাতকদের ওপর। পড়াশোনা শেষ করার পর অস্ট্রেলিয়ায় থেকে কাজের সুযোগ দেওয়া বর্তমান ‘অস্থায়ী স্নাতক ভিসা’ বাতিল করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বর্তমানে এই ভিসায় থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার। বিরোধী জোট ক্ষমতায় গেলে সেটি মাত্র ১০ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

একই সঙ্গে প্রতিবছর নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার সীমা ২ লাখ ৪০ হাজারে বেঁধে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার সুযোগও সীমিত বা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

তবে সব শিক্ষার্থীকে একই নিয়মের আওতায় রাখা হবে না। পিএইচডি গবেষক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরতদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এসব শিক্ষার্থীর জন্য নতুন ধরনের ‘পড়াশোনা-পরবর্তী সাময়িক ভিসা’ চালুর পরিকল্পনা করেছে বিরোধী জোট। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও বয়স্কসেবা খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের অস্থায়ী ভিসা বাড়ানোর সুযোগও রাখা হবে।

অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকেই করতে হবে পরবর্তী ভিসার আবেদন

নতুন নীতিতে অস্থায়ী ভিসার দ্বিতীয় বা পরবর্তী আবেদন করার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে এসব আবেদন অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে করা যাবে না। আবেদনকারীকে দেশটির বাইরে থেকেই আবেদন করতে হবে।

এর পাশাপাশি অপেক্ষমাণ ভিসা আবেদনকারীদের জন্য ব্যবহৃত ‘ব্রিজিং ভিসা’ এবং অস্থায়ী আশ্রয় ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মানবিক ভিসার সংখ্যাও বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে বছরে ১০ হাজারে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে দক্ষ কর্মীদের জন্য অস্থায়ী ভিসার সুযোগ বাড়িয়ে এক লাখ পর্যন্ত করার কথা বলেছে কোয়ালিশন।

নীতিটি তুলে ধরে অ্যাঙ্গাস টেইলর অস্ট্রেলিয়াকে ‘হোটেল নয়, বাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল অর্থ হলো, যারা অস্ট্রেলিয়ায় আসছেন তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবদান ও দেশের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

রাজনৈতিক চাপও কাজ করছে

অভিবাসন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপও বাড়ছে। কট্টর অভিবাসনবিরোধী দল ওয়ান নেশন ইতোমধ্যে তিন বছরের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ অস্থায়ী ভিসাধারীকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

জরিপে ওয়ান নেশনের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার চাপ থেকেই বিরোধী জোট আরও কঠোর অভিবাসন নীতি সামনে এনেছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন লেবার সরকার গত মাসে জানিয়েছিল, ২০২৮ সালের মধ্যে নিট অভিবাসন বছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। সেই তুলনায় কোয়ালিশনের প্রস্তাবিত সংখ্যা আরও কম।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও উদ্বেগ

বিরোধী জোটের নতুন অভিবাসন নীতি প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়ায় থাকা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পড়াশোনা শেষ করে কাজের মাধ্যমে ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ খুঁজছেন এমন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সিডনিতে পড়াশোনা শেষ করা এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ টিউশন ফি দিয়ে কয়েক বছর পড়াশোনা করার পরও যদি পড়াশোনা-পরবর্তী কাজের ভিসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

আরেক বাংলাদেশি কমিউনিটি কর্মী ও ব্যবসায়ীর মতে, আবাসন ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির মতো সমস্যার দায় অভিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, নির্বাচনী রাজনীতিতে অভিবাসন এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে।

সরকারের সমালোচনা

বিরোধী জোটের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরাও। অভিবাসন বিভাগের সাবেক উপসচিব ও বিশেষজ্ঞ আবুল রিজভী এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের দিক থেকে কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন।

তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে অল্প সময়ে কয়েক লাখ ব্রিজিং ভিসার বিষয় নিষ্পত্তি করা সহজ নয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও সেবামূলক খাতে দেশটির বিদ্যমান কর্মী সংকটের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

ক্ষমতাসীন সরকারের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কও কোয়ালিশনের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে হঠকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন, এমন নীতি বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্বে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিভিন্ন সেবা খাতে কর্মীর সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।

তবে এখনই এই নীতি কার্যকর হচ্ছে না। এটি আপাতত বিরোধী জোটের নির্বাচনী প্রস্তাব হিসেবেই রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাচন ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই নির্বাচনে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে পারলেই প্রস্তাবিত অভিবাসন নীতিগুলো বাস্তবায়নের পথে এগোনোর সুযোগ পাবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G