কন্যাসন্তান কেন আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নিয়ামত?

প্রকাশঃ জুলাই ১৭, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৪২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৪২ অপরাহ্ণ

কোনো পরিবারের জন্য নবজাতকের আগমন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু এখনও সমাজের কিছু জায়গায় কন্যাসন্তানের জন্মকে আনন্দের বদলে হতাশার চোখে দেখা হয়। সময় বদলেছে, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে মানুষ এগিয়েছে, তবু অনেকের মানসিকতায় রয়ে গেছে সেই পুরোনো বৈষম্য। কোথাও কন্যাসন্তানের জন্মে মায়ের ওপর দোষ চাপানো হয়, কোথাও তাকে শুনতে হয় নানা কটু কথা। অথচ একটি নবজাতকের ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার পেছনে মানুষের কোনো হাত নেই।

ইসলামের দৃষ্টিতে ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানই আল্লাহ তাআলার অমূল্য নিয়ামত ও আমানত। সন্তান দান এবং তার লিঙ্গ নির্ধারণ সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন, আবার কাউকে উভয় সন্তান দান করেন এবং কাউকে সন্তানহীন রাখেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। (সুরা আশ-শুরা: ৪৯-৫০)

এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, সন্তানের ছেলে বা মেয়ে হওয়া মানুষের সিদ্ধান্ত নয়। আধুনিক বিজ্ঞানও বলছে, সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের কোনো ভূমিকা নেই। তাই কন্যাসন্তানের জন্মের জন্য মাকে দায়ী করা অজ্ঞতা ও অন্যায়।

জাহেলি যুগের ভুল ধারণার অবসান

ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে কন্যাসন্তানকে অপমান ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। এমনকি অনেকেই কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দিত। কোরআনে এই নৃশংস মানসিকতার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে লজ্জা ও দুঃখে মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকত। (সুরা আন-নাহল: ৫৮-৫৯)

ইসলাম এসে এই অন্যায় প্রথার অবসান ঘটিয়েছে এবং কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে।

কন্যাসন্তানের প্রতি নবী (সা.)-এর ভালোবাসা

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের কন্যাদের প্রতি গভীর স্নেহ ও ভালোবাসার নজির স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, “ফাতিমা আমার দেহের একটি অংশ। তাকে যে কষ্ট দেয়, সে যেন আমাকে কষ্ট দেয়।” (সহিহ বুখারি: ৩৭৬৭)

আরও বর্ণিত আছে, সফরে যাওয়ার আগে তিনি সর্বশেষ হজরত ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং ফিরে এসে প্রথমেই তাঁর বাড়িতে যেতেন। (আবু দাউদ: ৪২১৩)

এসব ঘটনা কন্যাসন্তানের প্রতি ইসলামের সম্মান ও ভালোবাসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কন্যাসন্তান লালন-পালনের প্রতিদান

হাদিসে কন্যাসন্তানকে সঠিকভাবে লালন-পালনের জন্য বড় সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুটি কন্যাসন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সুন্দরভাবে লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন সে আমার এতটাই নিকটবর্তী থাকবে, এরপর তিনি নিজের দুটি আঙুল পাশাপাশি রেখে বিষয়টি বোঝান। (সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)

আরেক হাদিসে এসেছে, যার কন্যাসন্তান জন্ম নিল এবং সে তাকে অপমান করল না, জীবন্ত কবর দিল না কিংবা পুত্রসন্তানকে তার ওপর অগ্রাধিকার দিল না, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (আবু দাউদ: ৫১৪৬)

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যাদের কন্যাসন্তান রয়েছে এবং তারা তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, সেই কন্যারাই কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নাম থেকে রক্ষাকবচ হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৬২৯)

বোনদের প্রতিও রয়েছে একই গুরুত্ব

ইসলাম শুধু কন্যাসন্তান নয়, বোনদের প্রতিও দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার দুই বা তিনজন বোন কিংবা দুই বা তিনটি কন্যাসন্তান রয়েছে এবং সে তাদের যথাযথভাবে লালন-পালন করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তার জন্য রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ। (জামে তিরমিজি: ১৯১৬)

ইসলামের শিক্ষা

কন্যাসন্তান কখনো বোঝা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ নিয়ামত ও রহমত। তাই ছেলে-মেয়ের মধ্যে বৈষম্য না করে প্রত্যেক সন্তানকে সমান ভালোবাসা, যত্ন ও মর্যাদা দেওয়া একজন মুসলিমের দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে কন্যাসন্তান ও বোনদের যথাযথ সম্মান, ভালোবাসা এবং ন্যায়সংগত আচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G