কেন মহররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়?
মহররম মাস এলেই মুসলিম সমাজে কারবালার স্মৃতি ও আশুরার আলোচনা গুরুত্ব পায়। তবে অনেক সময় এই আবেগঘন ইতিহাসের আড়ালে মহররমের মূল ধর্মীয় মর্যাদা ও ফজিলতের বিষয়টি আড়াল হয়ে যায়। অথচ ইসলামে কারবালার ঘটনার বহু আগে থেকেই মহররমকে বিশেষ সম্মানের মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
হাদিসে এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, হিজরি বছরের ১২ মাসের মধ্যে শুধু মহররমই কেন এমন বিশেষ পরিচয় লাভ করল?
চার পবিত্র মাসের একটি
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন, আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর থেকে বছরের ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই চার মাস হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম এবং রজব।
ইসলামি পরিভাষায় এগুলোকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা সম্মানিত মাস বলা হয়। জাহেলি যুগেও আরবরা এসব মাসে যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকত। ইসলাম সেই মর্যাদাকে আরও সুসংহত ও অর্থবহ করেছে।
তাফসিরবিদদের মতে, এসব মাসে নেক আমলের সওয়াব বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে গুনাহের দায়ও তুলনামূলক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।
কেন বলা হয় ‘আল্লাহর মাস’?
হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম নফল রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। এ হাদিসেই মহররমকে ‘আল্লাহর মাস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামি শিক্ষায় কোনো কিছুর সঙ্গে আল্লাহর নাম যুক্ত হওয়া বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। যেমন কাবাকে বলা হয় বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর। একইভাবে মহররমকে আল্লাহর মাস বলা হয়েছে এর বিশেষ পবিত্রতা ও মর্যাদা প্রকাশের জন্য।
ইসলামি গবেষকদের মতে, এই মাসের সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত। জাহেলি যুগে আরবের কিছু গোত্র নিজেদের সুবিধামতো পবিত্র মাসের হিসাব পরিবর্তন করলেও ইসলাম মহররমের নির্ধারিত মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।
মহররমের গুরুত্বপূর্ণ আমল
মহররম মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তবে ১০ মহররম বা আশুরার দিনের রোজার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আশুরার রোজা আল্লাহর কাছে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের উসিলা হতে পারে।
তবে শুধু ১০ মহররম রোজা রাখার পরিবর্তে তার সঙ্গে ৯ বা ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা উত্তম। কারণ ইসলামে স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং মহানবী (সা.) নিজেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।
ফিকহবিদদের মতে, ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে রোজা রাখা সুন্নতের অধিক নিকটবর্তী।
প্রচলিত ভুল ধারণা
উপমহাদেশে অনেক মানুষ মহররম মাসকে অশুভ মনে করে থাকেন। কেউ কেউ এই মাসে বিয়ে বা অন্যান্য শুভ কাজ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
ইসলামে কোনো মাস বা দিনকে নিজস্বভাবে অমঙ্গলজনক মনে করা বৈধ নয়। বরং মহররম সম্মানিত ও বরকতময় মাসগুলোর অন্যতম।
কারবালার শোক ও মহররমের মর্যাদা
কারবালার ঘটনা মুসলিম ইতিহাসের অত্যন্ত হৃদয়বিদারক অধ্যায়। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর বেদনার বিষয়।
তবে মহররমের ধর্মীয় মর্যাদা কারবালার ঘটনার কারণে সৃষ্টি হয়নি। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের বহু আগেই এই মাস ইসলামে পবিত্র ও সম্মানিত হিসেবে স্বীকৃত ছিল।
তাই মহররমকে বুঝতে হলে একদিকে কারবালার শিক্ষা ও ত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করতে হবে, অন্যদিকে ইবাদত, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে এর প্রকৃত গুরুত্বও উপলব্ধি করতে হবে।
প্রতি / এডি / শাআ






















