মাতৃত্বকালীন ভাতা পেতে কীভাবে আবেদন করবেন, জানুন বিস্তারিত

প্রকাশঃ আগস্ট ২২, ২০২৬ সময়ঃ ১২:২০ পূর্বাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের আর্থিক সহায়তা দিতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি উদ্যোগে মাতৃত্বকালীন ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এটি ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ নামে পরিচালিত হচ্ছে।

এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়। গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পরিচর্যা এবং শিশুর প্রাথমিক বিকাশে সহায়তা করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। তবে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পরই একজন আবেদনকারীকে উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

কত টাকা পাওয়া যায়?

২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র মাসিক ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে। নির্বাচিত উপকারভোগীরা সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত এই সহায়তা পেতে পারেন।

তিন বছর অর্থাৎ ৩৬ মাস ধরে নিয়মিত ৮৫০ টাকা করে পেলে একজন উপকারভোগী মোট ৩০ হাজার ৬০০ টাকা পাবেন।

তবে বাস্তবে কত মাস ভাতা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে কর্মসূচির আওতায় নির্বাচনের সময়, যোগ্যতা এবং প্রযোজ্য সরকারি নিয়মের ওপর।

কারা এই ভাতা পেতে পারেন?

বর্তমান কর্মসূচিতে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের প্রথম বা দ্বিতীয় সন্তানের গর্ভবতী মায়েদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আবেদন করার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত রয়েছে।

সাধারণভাবে যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে—

  • আবেদনকারীর বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর হতে হবে।
  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি থাকতে হবে।
  • প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভাবস্থায় থাকা আবেদনকারীরা বিবেচিত হতে পারেন।
  • তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে সাধারণত এই কর্মসূচিতে আবেদন করা যায় না।
  • আবেদনকারীর নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাব থাকা প্রয়োজন।
  • পরিবারের মাসিক আয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আয় ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়।
  • স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে।

এ ছাড়া আবেদন করার সময় গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট পর্যায়ে থাকার শর্তও স্থানীয় নির্দেশনা অনুযায়ী প্রযোজ্য হতে পারে। তাই শুধু গর্ভবতী হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

কী কী কাগজপত্র ও তথ্য লাগতে পারে?

আবেদনের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো। এর মধ্যে থাকতে পারে—

  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • সচল মোবাইল নম্বর
  • নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য
  • বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার তথ্য
  • গর্ভাবস্থার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য
  • ছবি ও স্বাক্ষর
  • পরিবারের আয় ও আর্থিক অবস্থার তথ্য

আবেদনের ক্ষেত্রে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হিসাব ব্যবহার করা নিরাপদ। অন্য কারও মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহার না করাই ভালো।

অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে

মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আবেদন প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। প্রথমে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।

আবেদনের সাধারণ ধাপগুলো হলো—

১. অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ করুন
সরকারি আবেদন পোর্টালে গিয়ে নতুন আবেদন করার অপশন নির্বাচন করতে হবে।

২. পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য দিন
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ ও সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

৩. ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করুন
নাম, ঠিকানা, পরিবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে।

৪. গর্ভাবস্থা ও আর্থিক তথ্য দিন
গর্ভাবস্থার সময়কাল, সন্তানসংক্রান্ত তথ্য এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।

৫. ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড করুন
প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি ও স্বাক্ষর নির্ধারিত নিয়মে যুক্ত করতে হবে।

৬. তথ্য যাচাই করে আবেদন জমা দিন
সব তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে দেখার পর আবেদনটি চূড়ান্তভাবে জমা দিতে হবে।

আপনি নিজে অনলাইনে আবেদন করতে না পারলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার সহায়তাও নিতে পারেন।

কোথা থেকে আবেদন করতে হবে?

আবেদনকারীর নিজ এলাকার স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এলাকার নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে হতে পারে।

আবেদনকারী যে এলাকার নাগরিক বা ভোটার, সেই এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তারিত নিয়ম জানতে স্থানীয় উপজেলা বা জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

আবেদন করলেই কি ভাতা পাওয়া যাবে?

না।

অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি যাচাই-বাছাই করা হয়। আবেদন করলেই কেউ সরাসরি ভাতার উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচিত হন না।

আবেদন পাওয়ার পর তথ্য যাচাই, একই ব্যক্তি একাধিক সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন কি না তা পরীক্ষা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ের মতো ধাপ অনুসরণ করা হতে পারে।

সব যাচাই শেষে যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্য থেকে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।

কীভাবে ভাতার টাকা পাবেন?

নির্বাচিত উপকারভোগীর নিজস্ব আর্থিক হিসাবে ভাতার অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নিবন্ধিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্য ব্যক্তির নামে থাকা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহার করলে অর্থ গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই নিজের নামে থাকা এবং এনআইডির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাব ব্যবহার করাই নিরাপদ।

গুগল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লিংকে আবেদন নয়

মাতৃত্বকালীন ভাতার নামে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া লিংক ছড়ানোর সুযোগ থাকে। তাই কোনো লিংকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল নম্বর বা অন্য ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সেটি সরকারি ওয়েবসাইট কি না নিশ্চিত হতে হবে।

বিশেষ করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র ব্যবস্থা এবং অন্য সরকারি ভাতা কর্মসূচির অনলাইন ব্যবস্থা এক নয়। তাই ফেসবুক পোস্ট বা অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া লিংক অনুসরণ না করে সরকারি ওয়েবসাইট ও স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তথ্য নেওয়া নিরাপদ।

প্রতারণা থেকে যেভাবে সতর্ক থাকবেন

ভাতা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কেউ টাকা চাইলে সতর্ক থাকুন। সরকারি ভাতা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় দালাল বা অপরিচিত ব্যক্তির হাতে ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দেওয়া উচিত নয়।

কেউ যদি—

  • ওটিপি চায়
  • এনআইডির ছবি বা তথ্য নিজের ফোনে রাখতে চায়
  • নিজের হিসাব থেকে টাকা পাঠাতে বলে
  • ভাতা নিশ্চিত করে দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করে

তাহলে কোনো ধরনের লেনদেন না করাই নিরাপদ।

আবেদন করার আগে যা মনে রাখবেন

মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা পাওয়ার জন্য শুধু অনলাইনে ফরম পূরণ করাই যথেষ্ট নয়। আবেদনকারীর যোগ্যতা, স্থানীয় বরাদ্দ, তথ্য যাচাই এবং চূড়ান্ত নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়।

এ ছাড়া ভাতার পরিমাণ, আবেদন গ্রহণের সময়সীমা কিংবা যোগ্যতার শর্ত সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা এবং স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তথ্য যাচাই করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আওতায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৯ জন উপকারভোগীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে যোগ্য দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G