খলিফা ওমরের শাসনামলে পারস্য বিজয়ের ইতিহাস
একসময় পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত দুটি সাম্রাজ্য—রোমান বাইজেন্টাইন ও পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য। আধুনিক ইরান, ইরাক এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে প্রতিষ্ঠিত সাসানীয় সাম্রাজ্য প্রায় চার শতাব্দী ধরে শক্তিশালী সামরিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তি হিসেবে টিকে ছিল।
কিন্তু সপ্তম শতকে এসে সেই দীর্ঘদিনের আধিপত্যে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। মুসলিমদের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের মুখে সাসানীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে সংঘটিত কাদিসিয়া ও নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ পারস্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।
কাদিসিয়ার ময়দানে বড় সংঘর্ষ
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময় ইরাক অঞ্চলে মুসলিমদের যে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয়। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম বাহিনীর সাফল্য সাসানীয় শাসকদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। তারা বুঝতে পারে, সীমান্তের ছোটখাটো সংঘর্ষের পরিবর্তে এবার বড় ধরনের সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
পারস্যের সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ এ পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ সেনাপতি রুস্তমের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পারসিক বাহিনীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ বিশ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পান নবীজি (সা.)-এর মামা ও বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। মদিনা থেকে খলিফা ওমর (রা.) সামরিক কৌশল ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
হিজরি ১৬ সালে ইরাকের কাদিসিয়া অঞ্চলে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে মুসলিম পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে কয়েকজন প্রতিনিধি পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের কাছে যান।
সেই প্রতিনিধিদলের অন্যতম ছিলেন সাহাবি রিবয়ি ইবনে আমির (রা.)। পারস্যের রাজকীয় পরিবেশে প্রবেশ করেও তিনি মুসলিমদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, মানুষকে মানুষের অধীনতা থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানানো, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে পরকালের প্রশস্ততার পথে নেওয়া এবং অন্যায়ের পরিবর্তে ইসলামের ন্যায়বিচারের অধীনে আসার আহ্বানই ছিল তাঁদের অভিযানের উদ্দেশ্য।
(তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৩/৫২০, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)
হাতির বহর ও চার দিনের যুদ্ধ
শান্তি আলোচনায় সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হয়। পারসিক বাহিনীর অন্যতম বড় সুবিধা ছিল তাদের যুদ্ধহাতি। বিশাল আকৃতির হাতিগুলো মুসলিম অশ্বারোহীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে এবং যুদ্ধের প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে।
হাতির পিঠে থাকা সৈন্যদের আক্রমণেও মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে মুসলিম যোদ্ধারা কৌশল পরিবর্তন করে হাতিগুলোর চোখ ও শুঁড় লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাতে থাকেন। এতে বেশ কিছু হাতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছনের দিকে ছুটে যায় এবং নিজেদের বাহিনীর মধ্যেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
কাদিসিয়ার সংঘাত কয়েক দিন ধরে চলে। যুদ্ধের শেষ রাতটি পরে ‘লাইলাতুল হারির’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। রাতভর দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই চলে। অন্ধকারের মধ্যেও তরবারি, বর্শা ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল।
পরদিন ভোরের দিকে পারসিক সেনাপতি রুস্তম নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর সাসানীয় বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যায়।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধে ৩০ হাজারের বেশি পারসিক সৈন্য নিহত হন। মুসলিম বাহিনীরও প্রায় সাড়ে আট হাজার যোদ্ধা প্রাণ হারান। প্রাথমিক ইসলামি ইতিহাসে মুসলিমদের জন্য এটি ছিল অন্যতম বড় প্রাণহানির যুদ্ধ।
মাদায়েনের দরজা খুলে যায়
কাদিসিয়ায় পরাজয়ের পর সাসানীয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চল মুসলিম বাহিনীর জন্য অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তৎকালীন রাজধানী আল-মাদায়েনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি হয়।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী টাইগ্রিস নদী অতিক্রম করে মাদায়েনের দিকে এগিয়ে যায়। পারসিক প্রতিরোধ সেখানে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শেষ পর্যন্ত সাসানীয় বাহিনী শহর ছেড়ে সরে যায় এবং মুসলিমরা মাদায়েনের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
শহরটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ছিল ‘আইওয়ানে কিসরা’, যা সাসানীয় রাজকীয় স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। মুসলিমদের মাদায়েন প্রবেশের পর এই প্রাসাদও তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
সাদ (রা.) সেখানে কোরআনের সুরা দুখানের ২৫ থেকে ২৭ নম্বর আয়াত পাঠ করেন। ওই আয়াতগুলোতে পূর্ববর্তী জাতির রেখে যাওয়া বাগান, ঝরনা, শস্যক্ষেত, সুন্দর বাসস্থান ও ভোগ-বিলাসের সম্পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদায়েনের পতন সাসানীয় কেন্দ্রীয় শাসনের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দও রাজধানী ধরে রাখতে পারেননি। এরপর তিনি এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে আশ্রয় নিতে থাকেন। হুলওয়ান, রায়, ইসফাহান ও কিরমান হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি খোরাসান অঞ্চলে চলে যান।
(ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬৫, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
এরপর জলুলা ও তুসতারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। ফলে সাসানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে।
নাহাওয়ান্দে শেষ বড় প্রতিরোধ
মাদায়েন হারানোর পরও তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান। বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তিনি নতুন একটি বিশাল বাহিনী সংগঠিত করেন।
হিজরি ২১ সালে ইরানের নাহাওয়ান্দ অঞ্চলে পারসিকদের বড় একটি বাহিনী সমবেত হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাদের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় খলিফা ওমর (রা.) মদিনায় পরামর্শ সভা করেন। পরে অভিজ্ঞ সেনানায়ক নুমান ইবনে মুকররিন আল-মুজানি (রা.)-কে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়।
নাহাওয়ান্দে পৌঁছে মুসলিমরা দেখতে পান, পারসিকরা পাহাড়ঘেরা একটি সুবিধাজনক অবস্থান নিয়েছে। নিজেদের অবস্থান আরও সুরক্ষিত করতে তারা পরিখা খনন করেছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় ধারালো লোহার কাঁটা স্থাপন করেছিল।
এই পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনী সরাসরি আক্রমণের বদলে কৌশলের আশ্রয় নেয়। সাহাবি তালহা ইবনে খুওয়াইলিদের পরামর্শে অগ্রবর্তী দল আক্রমণ করে আবার পিছু হটার কৌশল নেয়। এতে পারসিকরা মুসলিম বাহিনীকে দুর্বল মনে করে তাদের নিরাপদ অবস্থান ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
এরপর শুরু হয় তীব্র সংঘর্ষ।
যুদ্ধের সময় সেনাপতি নুমান ইবনে মুকররিন (রা.) শহীদ হন। তবে তাঁর মৃত্যুর খবর তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) নেতৃত্ব গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীকে সামনে এগিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত পারসিক বাহিনী বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।
(ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ২/৫৭৫–৫৭৭, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ২০১২)
নাহাওয়ান্দের এই বিজয়কে মুসলিম ঐতিহাসিকদের অনেকে ‘ফাতহুল ফুতুহ’ বা ‘বিজয়ের মহাবিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ এর পর সাসানীয়দের পক্ষে আগের মতো বড় আকারের কেন্দ্রীয় বাহিনী সংগঠিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নুমানের শাহাদাতে ওমরের অশ্রু
নাহাওয়ান্দের বিজয়ের সংবাদ মদিনায় পৌঁছানোর পর খলিফা ওমর (রা.)-কে সেনাপতি নুমানের শাহাদাতের খবরও জানানো হয়। বর্ণনা অনুযায়ী, নুমানের মৃত্যুর কথা শুনে তিনি গভীরভাবে শোকাহত হন।
সংবাদদাতা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন যে নুমানের পাশাপাশি আরও অনেক মুসলিম যোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, যাদের ব্যক্তিগতভাবে খলিফার পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়নি।
জবাবে ওমর (রা.)-এর বক্তব্যের মর্মার্থ ছিল, দুনিয়ার মানুষের কাছে তাঁদের পরিচয় যতই অজানা হোক, আল্লাহ তাঁদের প্রত্যেককে জানেন এবং তাঁদের শাহাদাতের মর্যাদা তাঁর কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওমর তাঁদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও আল্লাহ তাঁদের পরিচিত।
(আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি, সিরাতু আমিরিল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব: শখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু, ২/১৯৮, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ২০০৩)
সাসানীয় সাম্রাজ্যের অবসান
নাহাওয়ান্দের পর পারস্যের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। হামাদান, ইসফাহান ও আজারবাইজানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাসানীয় কর্তৃত্ব ক্রমেই ক্ষয় হতে থাকে।
সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ শেষ পর্যন্ত খোরাসান অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখানেও তিনি হারানো সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগের শক্তি আর ফিরে পাননি।
পরবর্তী সময়ে আততায়ীর হাতে ইয়াজদেগার্দ নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বড় অংশ শাসন করা সাসানীয় সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
কাদিসিয়া থেকে নাহাওয়ান্দ পর্যন্ত ধারাবাহিক সামরিক সংঘাত শুধু একটি সাম্রাজ্যের পতনই ঘটায়নি, বরং সপ্তম শতকের পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।
প্রতি / এডি / শাআ






















