তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে সরকার

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৫৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৫৭ অপরাহ্ণ

উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বন্যা, নদীভাঙন ও পানিসংকট মোকাবিলায় আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নতুন অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্পটির মূল কাজ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে সামনে রেখে প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ২৩ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এই সমীক্ষার মাধ্যমে মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন উপাদানের কারিগরি বাস্তবতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল যাচাই করা হবে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে বড় প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপের কাজ আরও কাঠামোবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় উত্তরাঞ্চলের বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, পানি সংরক্ষণ এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও সংস্কারের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বাঁধের ওপর পাকা সড়ক তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। নদীশাসনের মাধ্যমে নদীর কাছাকাছি প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি পুনরুদ্ধার করে কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বলেন, সমন্বিত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সেচব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

তাঁর ভাষ্য, ২২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণ করা হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। বর্ষার সময় যেসব এলাকা পানিবন্দি হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সেসব অঞ্চলে বাঁধ ও সড়ক একসঙ্গে বন্যা প্রতিরোধ এবং যোগাযোগের অবকাঠামো হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

নদী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ বলেন, নদীর পলি জমার ধরন ও গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রেখে ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা করা হলে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমানের মতে, প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে উজান ও ভাটির পানিপ্রবাহ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম সাহাবুদ্দিন বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সমীক্ষার মাধ্যমে ব্যারেজ, নদীশাসন, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সংরক্ষণসহ প্রকল্পের প্রতিটি অংশের কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক যাচাই করা যাবে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, প্রস্তাবটি অগ্রাধিকার দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় পরবর্তী ধাপের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এরপর প্রকল্পটির প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তিস্তা নদীর কারণে দীর্ঘদিন ধরে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আসছেন। বর্ষায় নদীভাঙন ও বন্যা যেমন ঘরবাড়ি ও কৃষিজমির ক্ষতি করে, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটও তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়িত হলে এসব অঞ্চলের বন্যা ও ভাঙন পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি কৃষি, সেচ ও স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরিকল্পনায় উল্লেখ থাকা প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার জমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে সেটিও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, কারিগরি নকশা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং পানিপ্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি যাচাইয়ের মতো ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাঠামো আরও স্পষ্ট হবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

20G