পৃথিবীর চেয়েও বাসযোগ্য গ্রহের খোঁজে বিজ্ঞানীরা, মহাকাশে নতুন সম্ভাবনা
মানুষের বসবাসের জন্য পৃথিবীই কি মহাবিশ্বের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান? এত দিন ধরে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে, যেগুলোর পরিবেশ পৃথিবীর তুলনায় প্রাণের বিকাশের জন্য আরও অনুকূল। এসব সম্ভাব্য গ্রহকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘সুপারহ্যাবিটেবল’ বা অতিবাসযোগ্য গ্রহ।
পৃথিবীতে তরল পানি, অক্সিজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল এবং প্রাণের বিকাশের উপযোগী তাপমাত্রা থাকায় এখানে অসংখ্য প্রজাতির জীবের অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহে তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশের চরম বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষের স্বাভাবিকভাবে বসবাসের উপযোগী পরিস্থিতি নেই। তবে সৌরজগতের বাইরে অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহগুলোর মধ্যে কিছু গ্রহ পৃথিবীর চেয়েও অনুকূল পরিবেশ ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
পৃথিবীর চেয়েও ভালো হতে পারে যেসব গ্রহ
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে অতিবাসযোগ্য গ্রহ নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষকদের ধারণা, নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা গ্রহে প্রাণের বিকাশের জন্য পৃথিবীর তুলনায় বেশি অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের সম্ভাব্য গ্রহের আকার পৃথিবীর চেয়ে কিছুটা বড় হতে পারে। সেখানে তরল পানির উপস্থিতি, অপেক্ষাকৃত অনুকূল তাপমাত্রা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে পাওয়া গেলে তা প্রাণের বিকাশের জন্য সহায়ক হতে পারে।
তবে কোনো গ্রহের আকার বড় হলেই সেটি বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। গ্রহটির ভর, মহাকর্ষ, বায়ুমণ্ডলের গঠন, তাপমাত্রা, পানির উপস্থিতি এবং নিজ নক্ষত্র থেকে দূরত্বের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘সুপারহ্যাবিটেবল’ গ্রহ
অতিবাসযোগ্য গ্রহ নিয়ে গবেষণার মূল উদ্দেশ্য শুধু পৃথিবীর বিকল্প খোঁজা নয়। বরং কোন ধরনের পরিবেশে প্রাণের বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের সম্ভাবনা বেশি, তা বোঝাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
গবেষকদের ধারণা, কিছু গ্রহে বিস্তৃত অগভীর সমুদ্র, হ্রদ, দ্বীপপুঞ্জ এবং বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অগভীর জলাশয় ও উপকূলীয় এলাকায় জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ উপস্থিতি দেখা যায়। অন্য গ্রহেও যদি অনুরূপ পরিবেশ পাওয়া যায়, তবে সেগুলো প্রাণের বিকাশের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে।
কিছু গবেষণায় এমনও ধারণা দেওয়া হয়েছে, পৃথিবীর চেয়ে সামান্য বড় ও উষ্ণ গ্রহে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাণের জন্য বেশি অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে। তবে এসব বৈশিষ্ট্য সব গ্রহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
গবেষণায় নতুন নয় এই ধারণা
পৃথিবীর চেয়ে আরও বাসযোগ্য গ্রহ থাকতে পারে, এমন ধারণা জ্যোতির্বিজ্ঞানে বেশ কয়েক বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে। ২০১০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং এ বিষয়ে আলোচনা করেন। পরে ২০১৪ সালে তাঁরা অতিবাসযোগ্য গ্রহের ধারণা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
গবেষণাটিতে পৃথিবীর মতো গ্রহের পাশাপাশি এমন কিছু গ্রহের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে প্রাণের বিকাশের জন্য পরিবেশগত সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। পৃথিবীতে জীবনের বৈচিত্র্য ও দীর্ঘ বিবর্তন সম্ভব হলেও এর পরিবেশ নির্ভর করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর।
পৃথিবীর তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে জীবজগতের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সূর্যের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিও পৃথিবীর জলবায়ু ও বাসযোগ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ঠিক কত সময় পর পৃথিবী জটিল প্রাণের জন্য অনুপযোগী হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করে বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত প্রক্রিয়ার ওপর।
কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রের গ্রহে সম্ভাবনা
অতিবাসযোগ্য গ্রহের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে কে-ডোয়ার্ফ বা কে-শ্রেণির নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলোর প্রতি। এ ধরনের নক্ষত্র সাধারণত সূর্যের চেয়ে ছোট ও শীতল। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর আয়ুষ্কালও সূর্যের তুলনায় দীর্ঘ হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল শক্তি সরবরাহ করতে পারলে কোনো গ্রহে প্রাণের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া সম্ভব হতে পারে। এ কারণে কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে থাকা গ্রহগুলোকে বাসযোগ্যতার গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে কোনো গ্রহের নক্ষত্র দীর্ঘজীবী হলেই সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। গ্রহের বায়ুমণ্ডল, পানির উপস্থিতি, বিকিরণের মাত্রা এবং ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
নতুন গ্রহ খুঁজতে মহাকাশ অভিযান
সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান আরও এগিয়ে নিতে মহাকাশ গবেষকেরা উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্ল্যাটো’ (প্ল্যানেটারি ট্রানজিটস অ্যান্ড অসিলেশনস অব স্টারস) অভিযান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই অভিযানের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে তাদের চারপাশে থাকা গ্রহ শনাক্ত করা এবং নক্ষত্র ও গ্রহগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা। এর মাধ্যমে পৃথিবীর মতো গ্রহ এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্য পরিবেশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও বিস্তারিত ধারণা পেতে পারেন।
অন্যদিকে, নাসাসহ বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা সৌরজগতের বাইরে গ্রহ অনুসন্ধান এবং সেগুলোর বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণের প্রযুক্তি উন্নত করছে। এসব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহের সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গ্রহ পাওয়া গেলেই কি সেখানে বসবাস সম্ভব?
বিজ্ঞানীদের সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোনো গ্রহকে সম্ভাব্য বাসযোগ্য হিসেবে শনাক্ত করা আর সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। একইভাবে, কোনো গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকলেও সেখানে মানুষের বসতি স্থাপন করা সম্ভব হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এ জন্য প্রথমে গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের উপাদান, তাপমাত্রা, পানির উপস্থিতি, বিকিরণের মাত্রা এবং অন্যান্য পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে হবে। এরপর সেখানে অণুজীব বা অন্য কোনো ধরনের প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য প্রমাণ খুঁজতে হবে।
দূরবর্তী গ্রহে পৌঁছানো, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নিয়ে যাওয়া এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের ব্যবস্থা করাও অত্যন্ত জটিল কাজ। ফলে অতিবাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে বসতি গড়ার সম্ভাবনা নেই।
বিজ্ঞানীদের কাছে এই গবেষণার গুরুত্ব মূলত মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাবনা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ানো। পৃথিবীর বাইরে আরও অনুকূল পরিবেশের কোনো গ্রহ পাওয়া গেলে তা শুধু বিকল্প আবাসস্থল অনুসন্ধানেই নয়, পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















