বিশ্বে ২০২৬, আর ইথিওপিয়ায় শুরু হলো ২০১৯ সাল, কারণ কী?
পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে এখন ২০২৬ সাল। ক্যালেন্ডারের পাতায় বছরের সংখ্যা, মাস ও তারিখ নিয়ে তাই সবার হিসাব প্রায় একই। কিন্তু আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় চিত্রটা একেবারেই আলাদা। গত ১১ সেপ্টেম্বর দেশটি উদ্যাপন করেছে নতুন বছর। তবে সেই নতুন বছরের সংখ্যা ২০২৭ নয়, ২০২০-ও নয়; ইথিওপিয়ার নিজস্ব বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তারা প্রবেশ করেছে ২০১৯ সালে।
শুনতে অবাক লাগলেও এর পেছনে রয়েছে শত শত বছরের পুরোনো একটি আলাদা সময় গণনার পদ্ধতি। ইথিওপিয়া গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করে। এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার তুলনায় বছরের হিসাবে প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর পিছিয়ে। ২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে নতুন বছর শুরু হয়েছে ২০১৯ দিয়ে।
তাহলে একই পৃথিবীতে থেকেও ইথিওপিয়ার সালের হিসাব এতটা আলাদা কেন?
কেন ইথিওপিয়ার সাল আলাদা
ইথিওপিয়ার বর্ষপঞ্জিকে সাধারণভাবে গিজ বা ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডার বলা হয়। এটি প্রাচীন আলেকজান্দ্রীয় বা কপটিক ক্যালেন্ডার-ভিত্তিক একটি পদ্ধতি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য তৈরি হয়েছে খ্রিস্টের জন্ম ও ঘোষণার সময়কাল গণনার ভিন্ন পদ্ধতি থেকে। ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চ এখনো সেই পুরোনো হিসাব অনুসরণ করে। ফলে পশ্চিমা খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জির সঙ্গে ইথিওপিয়ার বছর সংখ্যায় ৭ থেকে ৮ বছরের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ইথিওপিয়া বাস্তবে পৃথিবীর সময় থেকে ৭ বা ৮ বছর পিছিয়ে নেই। একই দিনে দুই দেশে সূর্য ওঠে, মানুষ কাজ করে, বিমান উড়ে, ইন্টারনেট চলে। পার্থক্য শুধু বছর গণনার পদ্ধতিতে।
১৩ মাসের ক্যালেন্ডার
ইথিওপিয়ার বর্ষপঞ্জির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে বছরে ১২টি নয়, ১৩টি মাস।
প্রথম ১২টি মাসের প্রতিটিতে থাকে ৩০ দিন করে। অর্থাৎ ১২ মাসে মোট ৩৬০ দিন। এরপর বছরের শেষে আসে ছোট একটি ১৩তম মাস, যার নাম ‘পাগুমে’। সাধারণ বছরে এই মাসে থাকে পাঁচ দিন। অধিবর্ষে থাকে ছয় দিন।
এই হিসাবের কারণে ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডার দেখতে যেমন আলাদা, তেমনি বছরের শুরু এবং শেষের সময়ও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মেলে না।
ইথিওপিয়ার নতুন বছরের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘এনকুটাটাশ’। সাধারণত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ১১ সেপ্টেম্বর এই উৎসব পালিত হয়। নির্দিষ্ট অধিবর্ষের আগের বছরে তারিখটি ১২ সেপ্টেম্বর হতে পারে। ২০২৬ সালে ১১ সেপ্টেম্বরই ইথিওপিয়া ২০১৯ সালে প্রবেশ করেছে।
একই দেশে দুই ক্যালেন্ডার
বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য ইথিওপিয়াকে অবশ্যই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বিদেশি ব্যবসা, বিভিন্ন বৈশ্বিক যোগাযোগ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে গ্রেগরিয়ান তারিখ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে দেশের নিজস্ব সরকারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একজন ইথিওপিয়ান নাগরিককে প্রয়োজন অনুযায়ী দুই ধরনের তারিখের হিসাব বুঝতে হয়।
এ কারণে বাইরের মানুষের কাছে বিষয়টি বেশ জটিল মনে হলেও ইথিওপিয়ার মানুষের কাছে এটি দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। স্থানীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ বলা এবং প্রয়োজন হলে সেটিকে গ্রেগরিয়ান তারিখে মিলিয়ে নেওয়া তাদের কাছে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।
কেন ব্যবধান কখনো ৭, কখনো ৮ বছর
ইথিওপিয়ার সঙ্গে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবধান সারা বছর একই থাকে না। এর কারণ, ইথিওপিয়ার নতুন বছর শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাসে।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত ইথিওপিয়ার বছর সাধারণত আট বছর পিছিয়ে থাকে। এরপর সেপ্টেম্বরে নতুন বছর শুরু হলে ব্যবধান দাঁড়ায় সাত বছরে। তাই ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখের আগে ইথিওপিয়ায় ছিল ২০১৮ সাল। নতুন বছর শুরু হওয়ার পর সেটি হয়েছে ২০১৯।
অর্থাৎ ২০২৬ সালকে ইথিওপিয়ার মানুষ ২০১৯ নামে গণনা করছে মানেই তারা সময়ের দিক থেকে সাত বছর পিছিয়ে আছে, এমন নয়। এটি একই সময়ের ভিন্ন বর্ষসংখ্যা।
নতুন বছর আসে সেপ্টেম্বরে
ইথিওপিয়ার নতুন বছর জানুয়ারিতে শুরু হয় না। বছরের প্রথম মাস ‘মেসকেরেম’ শুরু হয় সেপ্টেম্বরে। এ সময় দেশটির বর্ষাকাল শেষের দিকে থাকে, প্রকৃতিতে দেখা যায় নতুন প্রাণের ছোঁয়া।
নতুন বছর বা এনকুটাটাশের সঙ্গে হলুদ রঙের ‘আদেই আবেবা’ ফুলের উপস্থিতিও জড়িয়ে আছে। বর্ষা শেষে ইথিওপিয়ার অনেক অঞ্চলে এই ফুল ফুটে ওঠে। ফলে নতুন বছর সেখানে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
এ কারণে অনেক ইথিওপিয়ানের কাছে সেপ্টেম্বরের এই সময়টিই নতুন বছর শুরুর জন্য স্বাভাবিক ও অর্থবহ।
শুধু ক্যালেন্ডার নয়, সময় গণনাতেও পার্থক্য
ইথিওপিয়ার সময় গণনার আরেকটি বৈশিষ্ট্যও বিদেশিদের অবাক করতে পারে। সেখানে প্রচলিত স্থানীয় সময় পদ্ধতিতে দিনের হিসাব শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে।
সাধারণ আন্তর্জাতিক ঘড়িতে সকাল ৬টা হলে ইথিওপিয়ান সময় গণনায় সেটিকে দিনের শুরু হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ স্থানীয় হিসাবে সূর্যোদয়ের সময় থেকেই প্রথম ঘণ্টা গণনা শুরু হয়। এই পদ্ধতি স্থানীয় জীবনে পরিচিত হলেও বিদেশিদের জন্য প্রথম দিকে বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলসহ বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি এড়াতে প্রচলিত আন্তর্জাতিক সময় ও গ্রেগরিয়ান তারিখ ব্যবহার করা হয়।
প্রযুক্তির যুগেও টিকে আছে পুরোনো পঞ্জিকা
ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও বৈশ্বিক যোগাযোগের যুগে ইথিওপিয়ার আলাদা ক্যালেন্ডার কীভাবে টিকে আছে, সেটিও আগ্রহের বিষয়।
এর উত্তর মূলত সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডার শুধু তারিখ লেখার একটি পদ্ধতি নয়; এর সঙ্গে দেশটির ধর্মীয় উৎসব, ঐতিহ্য, সামাজিক জীবন ও জাতীয় পরিচয় জড়িয়ে আছে।
তাই বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করলেও ইথিওপিয়া নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পঞ্জিকা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রয়োজন মেটাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারও ব্যবহার করছে।
আলাদা হলেও পিছিয়ে নয়
ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডার নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হতে পারে, দেশটি যেন পৃথিবীর সময় থেকে কয়েক বছর পিছিয়ে আছে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
ইথিওপিয়া এবং বিশ্বের অন্য দেশগুলো একই দিন ও একই সময়ে অবস্থান করছে। পার্থক্য শুধু সেই দিনের নাম ও বছরের সংখ্যা কীভাবে লেখা হচ্ছে, সেখানে।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে যখন ২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডারে সেটিই ২০১৯ সালের মেসকেরেম মাসের প্রথম দিন। অর্থাৎ একই দিন, একই পৃথিবী, কিন্তু দুটি আলাদা বর্ষপঞ্জিতে তার পরিচয় আলাদা।
আর এ কারণেই ২০২৬ সালে ইথিওপিয়ার ২০১৯ সালের নতুন বছর উদ্যাপনের ঘটনা প্রথমবার শুনলে যতটা বিস্ময়কর মনে হয়, বিষয়টি বুঝে দেখলে ততটাই পরিষ্কার হয়ে যায়। এটি সময়ের ব্যবধান নয়, বরং ইতিহাস থেকে চলে আসা একটি স্বতন্ত্র ক্যালেন্ডার ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা।
প্রতি / এডি / শাআ



















