যেভাবে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন এক মোড় নিয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বদলে যাচ্ছে পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যও। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার পর এখন যে নতুন বাস্তবতা সামনে আসছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রভাবিত করতে পারে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইরান। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে থাকা দেশটি এখন নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ পেয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ক্রমেই বৈরিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অনেকটা বাইরে অবস্থান করলেও সাম্প্রতিক সংঘাত সেই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ইরানের এই অবস্থানকে অনেকে চীনের অতীত উত্থানের সঙ্গে তুলনা করছেন। ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় চীনও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেকটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের উত্তেজনা কমতে শুরু করলে বেইজিং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন করে জায়গা তৈরি করে নেয়। এরপর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে চীন ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
তবে ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। চীনের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের পুনঃসম্পৃক্ততার পথও সহজ হবে না। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দেশটির সামনে রয়েছে একাধিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, দেশটির অভ্যন্তরে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে কোন ধরনের রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে একটি পক্ষ যদি অর্থনীতি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং বাস্তববাদী নীতির দিকে যেতে চায়, তাহলে অন্য পক্ষ সামরিক অর্জনকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির পক্ষে অবস্থান নিতে পারে।
চীনের ইতিহাসেও এমন একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিবর্তনের নজির রয়েছে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ডেন জিয়াওপিংয়ের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, লিন বিয়াওর ব্যর্থ অভ্যুত্থান, চৌ এনলাইকে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর ডেন জিয়াওপিংয়ের প্রত্যাবর্তন চীনের রাজনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চীন অর্থনৈতিক সংস্কার ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের পথে এগিয়ে যায়। কয়েক দশকের সেই পরিবর্তন দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ইরানের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নেতৃত্বের পরিবর্তন, যুদ্ধের ফলাফল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ দেশটির ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চীনের তুলনায় ইরানের পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ সম্ভাব্য রূপান্তরটি ঘটছে সরাসরি যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে।
ইরানের ভেতরে এমন একটি গোষ্ঠী থাকার কথা বলা হচ্ছে, যারা সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে মনোযোগ দেওয়ার পক্ষে। বিপরীতে, আরও কঠোর অবস্থানের সমর্থকেরা সামরিক চাপ অব্যাহত রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি করতে চাইতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, জুনের সংঘাতে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তেহরানের আগ্রহ নেই। পরবর্তী সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া পাল্টা প্রস্তাবেও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উঠে আসে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ২৭০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণের দাবি সামনে আসে। পরবর্তীতে জুনের মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকে সেই অঙ্ক ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। ফলে যুদ্ধের আর্থিক মূল্য কে বহন করবে, সেটিও ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ প্রণালী এই সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই জলপথের ওপর ইরানের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক রাজনীতিতে তেহরানকে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদও ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ইরানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যুদ্ধের মাধ্যমে সামরিক প্রভাব বাড়ানো এক বিষয়, আর সেই প্রভাবকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। চীনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে সামরিক শক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে একটি রাষ্ট্র তার প্রভাব বহুগুণ বাড়াতে পারে।
ইরান এখন এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটি কি সামরিক সাফল্যকে ভিত্তি করে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোবে, নাকি দীর্ঘদিনের সংঘাত ও প্রতিশোধের রাজনীতিকেই সামনে রাখবে, সেটিই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন।
যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি, ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের নতুন অবস্থান কতটা শক্তিশালী হয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে ইরানের ভূমিকা আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















