হারিয়ে যাওয়া সিডি-ক্যাসেট আবার ফিরছে, কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা
একসময় গান শোনা মানেই ছিল ক্যাসেট বা সিডির দোকানে গিয়ে পছন্দের অ্যালবাম কিনে আনা। নতুন কোনো শিল্পীর অ্যালবাম প্রকাশ হলে দোকানের সামনে ভিড় জমত। এরপর ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং সেবা ও স্মার্টফোনের বিস্তারে সেই অভ্যাস প্রায় হারিয়েই যায়।
কিন্তু প্রযুক্তির এত পরিবর্তনের পরও পুরোনো সেই মাধ্যম পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আবারও সিডি কেনার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। হাতে ধরে অ্যালবাম দেখা, সংগ্রহ করে রাখা এবং ইন্টারনেটের বাইরে গান শোনার অভিজ্ঞতাই অনেককে ফিরিয়ে আনছে এই পুরোনো মাধ্যমে।
বিনোদন জগতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান লুমিনেটের এক প্রতিবেদনে সিডির বিক্রি বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ভিনাইল রেকর্ডের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে সিডির বিক্রির প্রবৃদ্ধি দ্রুত হয়েছে। গত বছর সিডির বিক্রি প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়ে দেড় কোটির বেশি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, যখন স্পটিফাই, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কয়েক ক্লিকেই অসংখ্য গান শোনা যায়, তখন মানুষ আবার কেন সিডি কিনছে?
হাতে ধরা অ্যালবামের আলাদা অনুভূতি
সিডির প্রতি নতুন করে আগ্রহের পেছনে প্রযুক্তিগত কারণের পাশাপাশি রয়েছে আবেগ ও ব্যক্তিগত পছন্দ। যুক্তরাষ্ট্রের ৩১ বছর বয়সী মাইকেল সোয়ালবার্গের কাছে গান শোনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটি বাস্তব অনুভূতিও গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে শুধু পর্দায় স্পর্শ করে গান চালানোর বদলে তিনি হাতে ধরে অ্যালবাম দেখতেই বেশি পছন্দ করেন। সিডির কভার খোলা, ভেতরের বুকলেট দেখা কিংবা অ্যালবামের ছবি ও নকশা হাতে নিয়ে উপভোগ করার মধ্যে তিনি আলাদা আনন্দ খুঁজে পান।
অনেকের কাছে আবার সিডি পুরোনো দিনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শৈশব বা কৈশোরের প্রিয় গান, প্রিয় শিল্পীর অ্যালবাম কিংবা পুরোনো কোনো সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সিডি তাদের কাছে নিছক গান শোনার মাধ্যম নয়, বরং স্মৃতির অংশ।
শব্দের মানও টানছে শ্রোতাদের
সিডির প্রতি আগ্রহের আরেকটি কারণ হিসেবে অনেকে শব্দের মানের কথা বলছেন। তাদের ধারণা, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে গান শোনার তুলনায় ভালো মানের সিডিতে সংগীত আরও পরিষ্কারভাবে উপভোগ করা যায়।
ডিজিটাল মাধ্যমে গান শোনার সুবিধা অনেক বেশি হলেও সেখানে ইন্টারনেট সংযোগ, সাবস্ক্রিপশন কিংবা প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো গান একটি সেবা থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে সেটি আর আগের মতো পাওয়া নাও যেতে পারে।
সিডির ক্ষেত্রে সেই নির্ভরতা নেই। একবার অ্যালবামটি কিনে রাখলে ইন্টারনেট ছাড়াই সেটি শোনা যায়। ফলে যাঁরা নিজেদের পছন্দের গান দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করতে চান, তাঁদের কাছেও সিডি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তির বাইরেও সিডির ব্যবহার
সিডির ফিরে আসার গল্পে শুধু নস্টালজিয়া কাজ করছে না। কিছু ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের বাস্তব পরিস্থিতিও পুরোনো এই মাধ্যমের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে এক কিশোর জানিয়েছে, তাদের স্কুলে মুঠোফোন ও ইয়ারবাড নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। ফলে গান শোনার জন্য সে বাড়িতে থাকা বাবার পুরোনো ডিস্কম্যান ব্যবহার করছে।
অর্থাৎ কারও কাছে সিডি স্মৃতি, কারও কাছে সংগ্রহের বস্তু, আবার কারও কাছে এটি ডিজিটাল নির্ভরতার বাইরে গান শোনার একটি বিকল্প মাধ্যম।
কে-পপ ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা
সিডির বাজারে নতুন করে প্রাণ ফেরানোর ক্ষেত্রে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীদেরও ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে কে-পপের জনপ্রিয়তা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
বিটিএসের মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডের অ্যালবাম প্রকাশের সময় বিপুলসংখ্যক সিডি বিক্রি হয়েছে। তবে শুধু কে-পপের ওপর নির্ভর করেই সিডির বাজার বাড়ছে না। জেনজি ও তরুণ শ্রোতারাও এতে বড় ভূমিকা রাখছেন।
মজার বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ নিজেদের সময়ের গানের পাশাপাশি নব্বইয়ের দশক কিংবা তারও আগের সংগীত সিডিতে সংগ্রহ করতে আগ্রহী। ফলে পুরোনো সংগীতের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটি নতুন ধরনের সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুবিধা
সিডির আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। ভিনাইল রেকর্ড ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে। ক্যাসেটের চৌম্বকীয় টেপও সময়ের সঙ্গে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
অন্যদিকে সিডিতে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য পড়া হয়। ফলে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে বারবার চালালেও একই ধরনের ঘর্ষণজনিত ক্ষয় হয় না।
অবশ্য সিডি একেবারে অক্ষয় নয়। অতিরিক্ত আঁচড়, ভাঙা, তাপ বা ভুলভাবে সংরক্ষণের কারণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে যত্ন নিয়ে রাখলে দীর্ঘ সময় ধরে এর মধ্যে থাকা সংগীত ব্যবহার করা সম্ভব।
তুলনামূলক কম দামও বড় কারণ
সিডি আবার জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে এর তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচও একটি কারণ। ‘বেইলেন’ ব্যান্ডের সদস্য ডেভিড বেইলনের মতে, ভিনাইল রেকর্ডের তুলনায় সিডি তৈরি করা অনেক সাশ্রয়ী।
সংগীতশিল্পী জেমস কোয়েন্টিন ডিভাইনের মতে, সিডির দাম তুলনামূলক কম, সহজে বহন করা যায় এবং দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য নয়, প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়।
৪০ বছর বয়সী এলাদ মাসুরি কৈশোর থেকেই সিডি সংগ্রহ করছেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে প্রায় ৫০০টি সিডি রয়েছে। তার কাছে ডিজিটাল ফাইলের চেয়ে হাতে ধরা যায় এমন একটি অ্যালবামের মূল্য আলাদা।
হারিয়ে যাওয়া দোকান কি আবার ফিরবে?
বাংলাদেশেও একসময় ক্যাসেট, সিডি ও ডিভিডির দোকান ছিল বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। নব্বইয়ের দশকে নতুন গান কিংবা সিনেমার অ্যালবাম প্রকাশ হলেই এসব দোকানে ভিড় করতেন গানপ্রেমীরা।
স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো টিকে আছে সেগুলোর অনেকটাই এখন আগের মতো ব্যস্ত নয়।
তারপরও কিছু ব্যবসায়ী পুরোনো সিডি, ক্যাসেট ও ডিভিডির সংগ্রহ ধরে রেখেছেন। তাঁদের কাছে এগুলো শুধু পণ্য নয়, একটি সময়ের স্মৃতিও।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সিডির প্রতি আগ্রহ আবার বাড়তে থাকায় পুরোনো এই মাধ্যমটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মানুষের হাতে ধরে কিছু সংগ্রহ করার আকাঙ্ক্ষা যে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, সিডির প্রত্যাবর্তন যেন তারই একটি উদাহরণ।
হয়তো আগের মতো প্রতিটি ঘরে সিডি প্লেয়ার ফিরবে না। কিন্তু গান, স্মৃতি আর সংগ্রহের সঙ্গে সিডির যে আবেগ জড়িয়ে আছে, সেটি নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আরও কিছুদিন টিকে থাকবে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রতি / এডি / শাআ



















