কয়েক দশকের বন্ধুত্বের পর ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল, তারা আপন বোন !
দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে একে অপরকে ‘বোন’ বলেই ডাকতেন তারা। চেহারা, হাসি কিংবা অঙ্গভঙ্গিতে মিল থাকলেও বিষয়টিকে কখনো রক্তের সম্পর্ক হিসেবে ভাবেননি। কিন্তু কয়েক দশক পর একটি ডিএনএ পরীক্ষা তাদের সেই পুরোনো ধারণাকেই সত্যি করে দিল।
ভারতে জন্ম নেওয়া এবং পরে নেদারল্যান্ডসের দুটি আলাদা পরিবারে দত্তক হয়ে বেড়ে ওঠা মীনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিসেন জানতে পেরেছেন, তারা শুধু ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নন, একই বাবা-মায়ের সন্তান, অর্থাৎ আপন বোন।
মীনার বয়স এখন ৪৩ এবং মিনালের ৪৪ বছর। দুজনেরই জন্ম ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতের মুম্বাইয়ের দুটি পৃথক এতিমখানা থেকে তাদের দত্তক নেয় দুটি ডাচ পরিবার। এরপর তারা নেদারল্যান্ডসে বড় হয়ে ওঠেন।
প্রথম দেখাতেই চোখে পড়ে অদ্ভুত মিল
কৈশোরে নেদারল্যান্ডসে একটি দত্তক সংস্থার পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রথমবার দেখা হয় মীনা ও মিনালের। প্রথম সাক্ষাতেই দুজনের চেহারা ও আচরণে বেশ কিছু অস্বাভাবিক মিল তাদের নজরে আসে।
চেহারার গঠন, নাক, হাসির ধরন এমনকি কিছু অঙ্গভঙ্গিতেও মিল দেখে দুজনেই বিস্মিত হয়েছিলেন।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মীনা সেই প্রথম দেখার স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, অনুষ্ঠানে তাদের পরিচিতরা দুজনকে আয়নায় নিজেদের মুখ মিলিয়ে দেখতে বলেছিলেন। তখনই তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, মিনালের নাক ও হাসি তার নিজের মতোই দেখতে।
সেদিন রাতের খাবারের সময়ও মীনার চোখ বারবার মিনালের দিকেই চলে যাচ্ছিল।
পরদিন দুজন ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে। তখন অবশ্য তাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্কের তথ্য ছিল না। তারপরও অদ্ভুত এক টান অনুভব করতেন দুজন।
চিঠিতে একে অপরকে তারা ‘বোন’ বলে সম্বোধন করতেন। পড়াশোনা, কৈশোরের প্রেম, গান এবং প্রিয় ব্যান্ড ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের অ্যালবাম নিয়ে গল্প করতে করতেই কেটে যায় তাদের কৈশোর ও তারুণ্যের একটি বড় সময়।
প্রায় ১৫ বছর বিচ্ছিন্ন ছিলেন
জীবনের নানা ব্যস্ততায় একপর্যায়ে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১৫ বছর আগে দুজনের পথ আলাদা হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে প্রথম সন্তানের জন্মের পর নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মীনা।
তবে জন্মপরিচয় জানার আগ্রহ মীনার মধ্যে বরাবরই ছিল। ২০০৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি জন্মদাত্রী মায়ের সন্ধানে মুম্বাইয়ে ফিরে যান। যে এতিমখানায় তার শৈশবের শুরু হয়েছিল, সেখানে পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে নিজের পরিবারের বিষয়ে তথ্য খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখান থেকে কোনো স্বজনের সন্ধান পাননি।
ডিএনএ পরীক্ষায়ও প্রথমে মেলেনি সূত্র
২০১৭ সালে নিজের জন্মপরিচয় খুঁজতে মীনা ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন। কিন্তু তখন সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডারে তার কোনো পরিচিত আত্মীয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
একপর্যায়ে ফোনের মেমোরি পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ-সংক্রান্ত অ্যাপটিও মুছে ফেলেন তিনি। ফলে বিষয়টি সেখানেই থেমে যায়।
এরপর কেটে যায় আরও কয়েক বছর।
দ্বিতীয় পরীক্ষায় খুলে গেল রহস্য
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে এসে মিনাল নিজের ডিএনএ পরীক্ষা করান। মে মাসে পরীক্ষার ফল হাতে আসার পরই সামনে আসে অবিশ্বাস্য তথ্য।
ডিএনএ বিশ্লেষণে মীনার সঙ্গে মিনালের এমন মিল পাওয়া যায়, যা তাদের একই বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
২০ মে ফেসবুকের মাধ্যমে মীনাকে খবরটি জানান মিনাল।
হঠাৎ পাওয়া সেই বার্তায় মীনা এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে ডিএনএ পরীক্ষার অ্যাপটিতে ঢুকতে গিয়ে প্রায় ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন।
মীনা বলেন, তারা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে ‘বোন’ বলে ডাকতেন। ডিএনএ পরীক্ষার ফল যেন তাদের বহু বছরের সেই অনুভূতিকেই সত্যি প্রমাণ করেছে।
বন্ধুত্বের পর জানা গেল রক্তের সম্পর্ক
সত্যটি জানার পর গত আগস্টে দুই বোনের আবেগঘন পুনর্মিলন হয়। বহু বছর পর মুখোমুখি হয়ে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। আনন্দ ও আবেগে চোখে পানি চলে আসে দুজনের।
সেই মুহূর্তে বোন হিসেবে জীবনের প্রথম সেলফিও তোলেন তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে মিনাল বলেন, বোন হওয়ার সত্য জানার আগেই তারা বন্ধু ছিলেন। এতদিন তারা জানতেনই না যে তাদের সম্পর্ক আসলে আরও গভীর।
বর্তমানে দুই সন্তান নিয়ে ফ্রান্সে বসবাস করছেন মিনাল। অন্যদিকে মীনা তিন সন্তানের মা।
এখন তাদের পরিবারের সদস্যরাও দুজনের মধ্যে মিল দেখে বিস্মিত হন। কথা বলার ধরন, চলাফেরা এমনকি হাঁটার ভঙ্গিতেও যে মিল রয়েছে, তা পরিবারের সদস্যদের চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এবার একসঙ্গে ভারতে ফেরার পরিকল্পনা
কয়েক দশক একে অপরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেননি, এ নিয়ে দুজনেরই কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে। তবে সেই হারানো সময় পূরণ করার চেষ্টা করছেন তারা।
এখন তাদের পরিকল্পনা, একসঙ্গে ভারতে যাওয়া। মুম্বাইয়ের সেই পুরোনো শহর, যেখান থেকে তাদের জীবনের গল্প আলাদা পথে শুরু হয়েছিল, সেখানে এবার তারা ফিরতে চান বোন হিসেবে।
যে দুই শিশু কয়েক দশক আগে দুটি আলাদা পরিবারে দত্তক হয়ে আলাদা জীবনে পা রেখেছিল, ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় তারাই আবার বহু বছর পর একে অপরকে খুঁজে পেলেন। তবে এবার বন্ধুত্বের পরিচয়ে নয়, আপন বোনের সম্পর্ক নিয়ে।
প্রতি / এডি / শাআ























