গোলের বাইরে এক যোদ্ধার গল্প

প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৫৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:০২ অপরাহ্ণ

আলো-ঝলমলে ক্যারিয়ারের আড়ালের অজানা গল্প

ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। Cristiano Ronaldo সেই বিরল ক’জনের একজন। মাঠে তার গতি, লাফ, নিখুঁত ফিনিশিং—এসব নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আলোচনার আড়ালে থেকে গেছে তার জীবনের কিছু কম-জানা অধ্যায়, যা রোনালদোকে শুধু মহান ফুটবলার নয়, এক অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।

জন্মের গল্পে লুকানো রাজনৈতিক ছায়া

রোনালদোর পুরো নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দোস সান্তোস আভেইরো। “রোনালদো” নামটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Ronald Reagan–এর নাম থেকে। তার বাবা ছিলেন রিগ্যানের ভক্ত। খুব কম মানুষ জানেন, রিগ্যান একসময় হলিউড অভিনেতাও ছিলেন—আর সেই তারকাখ্যাতির প্রভাবেই ছেলের নাম রাখেন রোনালদো।

হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার: ১৫ বছর বয়সেই বড় লড়াই

কৈশোরে তার হৃদযন্ত্রে “রেসিং হার্ট” সমস্যা ধরা পড়ে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে লেজার সার্জারি করতে হয়। চিকিৎসকেরা তাকে সাময়িকভাবে ফুটবল থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো থেমে যাবে প্রতিভার গল্প। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনুশীলনে ফিরে আসেন তিনি—আর তারপর ইতিহাস।

যে কারণে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল

রোনালদো কখনো উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পারেননি। ১৪ বছর বয়সে এক শিক্ষককে চেয়ার ছুড়ে মারার ঘটনায় তাকে স্কুল ছাড়তে হয়। পরে তিনি স্বীকার করেন, সেটা ছিল আবেগের ভুল। কিন্তু সেই ঘটনাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়—তিনি পুরোপুরি ফুটবলে মন দেন।

বিলাসী জীবন, কিন্তু অ্যালকোহল নয়

বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য পরিচিত হলেও রোনালদো অ্যালকোহল স্পর্শ করেন না। তার বাবা মদ্যপানের কারণে অকালমৃত্যু বরণ করেন—এই অভিজ্ঞতা তাকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ট্যাটুও করান না, কারণ নিয়মিত রক্তদান করেন। বছরে অন্তত দুইবার রক্ত দেন তিনি—যা অনেক ভক্তই জানেন না।

নিঃশব্দ দানশীলতা

রোনালদোর মানবিক দিকটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে তাকে বিশ্বের অন্যতম দানশীল ক্রীড়াবিদ বলা হয়েছে। শিশুদের চিকিৎসা, দুর্যোগ ত্রাণ, ক্যান্সার গবেষণা—নানা খাতে তিনি গোপনে অর্থ সহায়তা করেছেন। একবার চ্যাম্পিয়নস লিগ বোনাসের পুরো অর্থ দান করেছিলেন একটি এনজিওকে—যদিও বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে চাননি।

অবিশ্বাস্য শারীরিক পরিসংখ্যান

বিজ্ঞানীরা একাধিকবার তার শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা করেছেন। দেখা গেছে, তার শরীরের চর্বির পরিমাণ গড় ফুটবলারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। লাফানোর সময় তিনি প্রায় বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের সমান উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন। ২০১৩ সালে একটি পরীক্ষায় তার জাম্পের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭৮ সেন্টিমিটার—যা এনবিএ খেলোয়াড়দের গড়ের কাছাকাছি।

নিখুঁত পেশাদারিত্বের গল্প

Manchester United F.C.–এ প্রথম সময়টায় সতীর্থরা তার বাড়তি অনুশীলন নিয়ে হাসাহাসি করতেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, ম্যাচের পরও তিনি একা জিমে থেকে যেতেন। কোচরা বলেন, রোনালদোর সবচেয়ে বড় প্রতিভা তার পরিশ্রম।

পরে Real Madrid CF–এ যোগ দিয়ে তিনি গোলের পর গোল করে ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। এরপর Juventus FC এবং সর্বশেষ Al Nassr FC–এ খেলেও একই পেশাদার মানসিকতা বজায় রেখেছেন।

যে ট্রফির পেছনে এক অদম্য সাধনা

পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়—এই কৃতিত্বই তাকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে বসিয়েছে। তবে তার ভাষায়, “প্রতিভা আপনাকে শুরুটা এনে দেয়, কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আপনাকে শীর্ষে রাখে।”

পরিসংখ্যানের বাইরে এক মানসিকতা

রোনালদো নিজেকে সবসময় “প্রকল্প” হিসেবে দেখেন—প্রতিদিন একটু করে উন্নতির চেষ্টা। তার ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, অনুশীলন—সবকিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত। বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই হলেও তার ফিটনেস এখনও বিস্ময় জাগায়।

এক জীবন্ত অধ্যায়

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো শুধু গোলের মেশিন নন; তিনি আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা আর পুনর্জন্মের গল্প। দারিদ্র্য থেকে শুরু করে বিশ্বজয়ের পথ—তার জীবন প্রমাণ করে, সীমাবদ্ধতা নয়, মানসিক শক্তিই মানুষকে বড় করে তোলে।

মাঠে তিনি হয়তো একদিন থামবেন। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের যে পাঠ তিনি রেখে যাচ্ছেন—তা অনুপ্রেরণার বই হয়ে থাকবে বহু প্রজন্মের কাছে।

 

প্রতি /এডি /শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

সর্বাধিক পঠিত

20G