টিয়াপাখির মানুষের মতো কথা বলার রহস্য কী
কখনো কি এমন টিয়াপাখি দেখেছেন, যে অবিকল মানুষের গলায় কথা বলে, গান গায়, আবার কখনো কুকুরের মতো শব্দও করে? অনেকেই পাখির দোকানে, পরিচিত কারও বাসায় কিংবা সামাজিক মাধ্যমে এমন টিয়ার ভিডিও দেখে বিস্মিত হয়েছেন। হঠাৎ কোনো পাখি যদি বলে ওঠে, ‘কেমন আছ?’ বা ‘কি করছ?’, তখন অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি পাখি কীভাবে মানুষের ভাষা এত নিখুঁতভাবে অনুকরণ করে?
বিষয়টি শুনতে অবাক লাগলেও, এক অর্থে পৃথিবীর প্রায় সব পাখিই নিজেদের ভাষায় ‘কথা’ বলে। তবে সেই ভাষা মানুষের ভাষার মতো নয়। তারা বিভিন্ন ধরনের ডাক, শিস ও শব্দের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিপদের সংকেত দিতে এক ধরনের শব্দ, সঙ্গীকে ডাকতে আরেক ধরনের আওয়াজ, আবার নিজেদের অবস্থান জানান দিতেও আলাদা সুর ব্যবহার করে।
তবে সব পাখি মানুষের মতো শব্দ নকল করতে পারে না। এই বিশেষ ক্ষমতা খুব সীমিত কিছু পাখির মধ্যেই দেখা যায়। টিয়াপাখি, ময়না, কাক, দাঁড়কাক ও স্টার্লিং প্রজাতির পাখি মানুষের কথা বা আশপাশের নানা শব্দ অনুকরণ করতে পারে। আর এই অসাধারণ দক্ষতার পেছনে কাজ করে তাদের শরীরের বিশেষ গঠন এবং অত্যন্ত উন্নত মস্তিষ্ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিয়াপাখির শরীরে ‘সিরিংক্স’ নামে একটি বিশেষ অঙ্গ থাকে, যা মানুষের স্বরযন্ত্রের মতো কাজ করে। এই অঙ্গটি তাদের শ্বাসনালির নিচের অংশে থাকে এবং খুব সূক্ষ্মভাবে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ কারণেই তারা নানা রকম জটিল শব্দ তৈরি করতে সক্ষম হয়।
শুধু শরীরের গঠনই নয়, টিয়াপাখির মস্তিষ্কও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের মস্তিষ্কে শব্দ অনুকরণ ও স্মরণ রাখার জন্য বিশেষ স্নায়বিক কাঠামো রয়েছে। তারা কোনো শব্দ বারবার শুনে সেটি মনে রাখে, বিশ্লেষণ করে এবং পরে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। অনেকটা শিশুর ভাষা শেখার প্রাথমিক ধাপের মতোই তারা শুনে শুনে শব্দ রপ্ত করে।
আসলে টিয়াপাখি মানুষের ভাষা বোঝে না, বরং শব্দ অনুকরণ করে। তারা কোন শব্দ কখন বলতে হবে, সেটাও অনেক সময় পরিবেশ দেখে শিখে ফেলে। যেমন, কেউ ঘরে ঢুকলে ‘কেমন আছ’ বলা বা খাবার দেখলে নির্দিষ্ট শব্দ করা। দীর্ঘদিন মানুষের আশপাশে থাকলে তারা আচরণ ও শব্দের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে শেখে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগের প্রবণতাই টিয়াপাখিকে এমন অনুকরণে দক্ষ করেছে। বনে তারা নিজেদের দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শব্দ ব্যবহার করে। মানুষের কাছে পোষা অবস্থায় সেই সামাজিক যোগাযোগের জায়গা নেয় মানুষের কণ্ঠস্বর। তাই তারা মানুষের সঙ্গেই ‘যোগাযোগ’ করার জন্য মানুষের শব্দ নকল করতে শুরু করে।
অর্থাৎ টিয়াপাখির মানুষের মতো কথা বলা কোনো জাদু নয়, বরং প্রকৃতির এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা। তাদের বিশেষ স্বরযন্ত্র, তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি এবং সামাজিক আচরণই টিয়াপাখিকে অন্য পাখিদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
প্রতি / এডি / শাআ













