যেদিন জেগে উঠেছিল একটি শহর

প্রকাশঃ জুলাই ৩, ২০২৬ সময়ঃ ৫:২৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৫:২৪ অপরাহ্ণ

নুসরাত শারমিন নিশা

একটা শহর জেগে উঠল।
জুলাইয়ের সকালটা ছিল আগের দিনের মতোই অস্থির।
ঢাকার আকাশে তখনও একই রকম গুমোট ভাব। কিন্তু রাস্তায় নেমে আসা শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল নতুন এক দৃঢ়তা। আগের দিনের ক্ষোভ যেন এক রাতেই আরও সংগঠিত হয়ে উঠেছে। সেদিন মনে হচ্ছিল, আন্দোলন আর শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন শহরের পথে হাঁটছে, মানুষের চোখের সামনে বড় হয়ে উঠছে, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দেশে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বের হয়। নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাব, বাটা সিগন্যাল পেরিয়ে সেই মিছিল পৌঁছে যায় শাহবাগে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয় গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়।
সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয়তো ছিল একটি সড়ক অবরোধ। কিন্তু আন্দোলনকারীদের কাছে এটি ছিল আরও স্পষ্ট একটি ঘোষণা—
“আমরা আর পেছনে ফিরব না।”
একই দিনে নড়ে বসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও। শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সাহস জোগায়। এভাবেই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি ক্যাম্পাস থেকেও বিক্ষোভের খবর আসতে থাকে।
স্লোগান প্রায় সব জায়গাতেই এক..
“কোটা সংস্কার চাই।
ন্যায্যতা চাই।
মেধার অবমূল্যায়ন চাই না।”
কিন্তু এই দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সরকারের নীরবতা এবং ভেতরের অস্থিরতা।
শেখ হাসিনা তখন সরকারের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন। তিনি রাজপথে ছিলেন না, ক্যাম্পাসেও ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই জায়গায়, যেখান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আর প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সক্রিয় করা হয়।
সরকারের অবস্থান তখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। আন্দোলন যেন আর বড় হতে না পারে। এটাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। কারণ তখন বোঝা যাচ্ছিল, বিষয়টি আর শুধু কোটা ব্যবস্থাকে ঘিরে কয়েকজন শিক্ষার্থীর ক্ষোভ নয়; এটি ধীরে ধীরে আরও বড় এক জনআলোচনায় পরিণত হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী আন্দোলনকে বারবার “অযৌক্তিক”, “অনাবশ্যক” কিংবা “আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য” বলে উল্লেখ করছিলেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হচ্ছিল, আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলা হচ্ছিল এবং রাজপথে চাপ সৃষ্টি করে কিছু অর্জন সম্ভব নয়.. এমন বার্তাও দেওয়া হচ্ছিল।
বাইরে সরকার বলছিল..
“আমরা বিষয়টি দেখছি।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল আন্দোলনের এই বিস্তার কোথায় গিয়ে থামবে?
ফলে ২ জুলাইয়ের ঢাকায় যেন পাশাপাশি দুটি দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল।
একদিকে রাজপথে হাজারো শিক্ষার্থীর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিবাদের স্লোগান। অন্যদিকে ক্ষমতার কক্ষগুলোতে চলছিল হিসাব-নিকাশ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।
২ জুলাই ছিল সেই দিন, যেদিন আন্দোলন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। প্রতিটি মিছিল যেন আরেকটি মিছিলকে জন্ম দিচ্ছিল, প্রতিটি স্লোগান পৌঁছে যাচ্ছিল নতুন নতুন ক্যাম্পাসে।
দিন শেষে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল শহর জেগে উঠেছে। আর যখন একটি শহর জেগে ওঠে, তখন শুধু রাজপথ বদলায় না; ইতিহাসও নতুন মোড় নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G