এআইয়ের নিখুঁত উত্তরের আড়ালে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের অবদান

প্রকাশঃ জুলাই ২৬, ২০২৬ সময়ঃ ১০:২৩ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:২৩ অপরাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে প্রোগ্রামিং, তথ্য বিশ্লেষণ ও কনটেন্ট তৈরির মতো অসংখ্য কাজ মুহূর্তেই করতে পারছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে পর্দার আড়ালে কাজ করছেন হাজারো মানুষ। তাদেরই একজন বড় অংশ বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের আয় থেকে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ বাংলাদেশি কর্মীদের দখলে ছিল। 

কী করেন এআই ডেটা অ্যানোটেটর?

এআই মডেলকে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ করে তোলার জন্য যে পেশাজীবীরা কাজ করেন, তাদের ডেটা অ্যানোটেটর বা এআই ট্রেইনার বলা হয়। তারা মডেলের উত্তর মূল্যায়ন করেন, ভুল শনাক্ত করেন, তথ্য শ্রেণিবিন্যাস করেন এবং কোন উত্তর গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।

মেটার সাবেক ডেটা অ্যানোটেটর তাওসিফ নিলয়ের ভাষ্য, তাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিভিন্ন নির্দেশনা অনুসারে এআইকে পরীক্ষা করা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে মডেল ভুল বা ক্ষতিকর উত্তর দিতে পারে কি না তা যাচাই করা। এ ধরনের পরীক্ষাকে সাধারণভাবে রেড-টিমিং বলা হয়।

এ ছাড়া ছবি, অডিও ও লেখা শনাক্তকরণ, চ্যাটবটের উত্তর মূল্যায়ন এবং তথ্য লেবেলিংয়ের মতো কাজও এই পেশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই এআই ধীরে ধীরে মানুষের ভাষা, পছন্দ এবং নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম শিখে।

দ্রুত বাড়ছে বৈশ্বিক বাজার

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্রেটস রিসার্চ বলছে, ২০২৫ সালে ডেটা অ্যানোটেশন টুলসের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালের মধ্যে এটি ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ৪৩ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের এআই প্রশিক্ষণ, কনটেন্ট রিভিউ ও ডেটা লেবেলিংয়ের কাজে যুক্ত রয়েছেন।

বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

ইংরেজিতে দক্ষ জনবল এবং অনলাইনভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রশিক্ষণ শিল্পও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাবিল মোহাম্মদ মনে করেন, এআই ডেটা অ্যানোটেশনের বর্তমান বাজার অনেকটা আগের বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) শিল্পের মতো। তবে এই খাতে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে শুধু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ নয়, উচ্চমানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের দিকেও নজর দিতে হবে।

তার মতে, উন্নত দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক এআই সরবরাহ ব্যবস্থার আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হতে পারে।

রয়েছে মজুরি বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা

যদিও এ খাতে কাজের সুযোগ বাড়ছে, তবুও আয়ের বৈষম্য একটি বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উন্নত দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করিয়ে তুলনামূলক কম পারিশ্রমিকে উন্নয়নশীল দেশের কর্মীদের নিয়োগ দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ডেটা লেবেলিংয়ের মতো কাজ সহজে শেখা যায় বলে এসব কর্মীর দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত থাকে। ফলে উচ্চ আয়ের সুযোগও তুলনামূলক কম।

অন্যদিকে, রেড-টিমিং, নীতিমালা প্রণয়ন বা জটিল এআই মূল্যায়নের মতো বিশেষায়িত কাজগুলোতে পারিশ্রমিক বেশি এবং অটোমেশনের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।

এআই-ই কি একদিন এই কাজগুলো করবে?

প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির কারণে আজ যে কাজ মানুষ করছে, ভবিষ্যতে তার একটি অংশ এআই নিজেই করতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই শুধুমাত্র সাধারণ দক্ষতার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নাবিল মোহাম্মদের মতে, বাংলাদেশের উচিত শুধু এআই ব্যবহারে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজস্ব প্রযুক্তি, গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়া। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ এবং গবেষণার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দেশ ভবিষ্যতের এআই শিল্পে আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল

চ্যালেঞ্জ থাকলেও এআই ডেটা অ্যানোটেশন খাত বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে কেবল সাধারণ লেবেলিং নয়, উচ্চতর প্রযুক্তিগত দক্ষতা, গবেষণা এবং উদ্ভাবননির্ভর কাজের দিকে এগিয়ে যাওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্রতি / এডি / শাআ 

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
20G