চীনে শুরু হলো রোবট বিপ্লব, এবার রোবটই হবে রোবটের নির্মাতা!
চীনে হিউম্যানয়েড রোবট উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে আরেক হিউম্যানয়েড রোবট। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি এতদিন মানুষের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করছিল, সেটিই এখন নতুন রোবট তৈরির উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে। চীনের লিউঝৌ শহরে চালু হওয়া নতুন একটি স্মার্ট কারখানায় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, রোবোটিক সিস্টেম এবং হিউম্যানয়েড রোবটের সমন্বয়ে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য নতুন রোবট তৈরি করা হচ্ছে।
চীনা রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক রোবোটিকস এই কারখানাটি চালু করেছে। গুয়াংশি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের লিউঝৌয়ে অবস্থিত উৎপাদনকেন্দ্রটির আয়তন প্রায় ১৪ হাজার বর্গমিটার এবং ভবনটির উচ্চতা ১৩ দশমিক ৮ মিটার। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে প্রতি ১০ মিনিটে একটি করে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী হিউম্যানয়েড রোবট উৎপাদন করা যায়। বার্ষিক সক্ষমতা ১০ হাজারের বেশি ইউনিট।
কারখানাটিতে মূলত ইউবিটেকের Walker S ও Cruzr সিরিজের রোবট তৈরি করা হচ্ছে। একই উৎপাদন ব্যবস্থায় একাধিক মডেল তৈরির সুবিধাও রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিটি রোবটের জন্য আলাদা উৎপাদন লাইন তৈরির প্রয়োজন কমছে।
রোবট যেখানে একই সঙ্গে পণ্য ও কর্মী
এই কারখানার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় রোবটের সরাসরি অংশগ্রহণ। কারখানায় তৈরি হওয়া কিছু হিউম্যানয়েড রোবটই আবার উৎপাদন লাইনে উপকরণ সরানো, সাজানো এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউবিটেকের Cruzr Y1 ও Cruzr S2 মডেলকে বিভিন্ন উপকরণ ওঠানো-নামানো, এক জায়গায় সাজিয়ে রাখা এবং উৎপাদন লাইনে সরবরাহের মতো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি কারখানার ভেতরে পণ্য ও যন্ত্রাংশ পরিবহনের জন্য চালকবিহীন যান এবং স্বয়ংক্রিয় গাইডেড ভেহিকলও রয়েছে।
অর্থাৎ, এখানে রোবট শুধু কারখানার চূড়ান্ত পণ্য নয়—উৎপাদন ব্যবস্থার কর্মী হিসেবেও কাজ করছে।
পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার পেছনে ‘স্মার্ট ব্রেইন’
কারখানার বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে ইউবিটেক। প্রতিষ্ঠানটি এই ব্যবস্থাকে ‘স্মার্ট ব্রেইন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
উৎপাদন লাইনে কোন কাজ কখন হবে, কোন উপকরণ কোথায় যাবে এবং একটি রোবট উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ কীভাবে সম্পন্ন হবে—এসব কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়।
প্রতিটি তৈরি হওয়া রোবটের জন্য আলাদা সিরিয়াল নম্বরও রাখা হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদনের শুরু থেকে পরীক্ষা পর্যন্ত রোবটটির বিভিন্ন তথ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব হয়।
কারখানাটি তৈরির ক্ষেত্রে ইউবিটেকের সঙ্গে Siemens Digital Industries Software-ও কাজ করেছে।
অ্যাসেম্বলিতেও ব্যবহার হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি
রোবটের চূড়ান্ত সংযোজনের সময় একাধিক ধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সহযোগী রোবোটিক বাহু, চালকবিহীন পরিবহন যান, স্বয়ংক্রিয় ম্যানিপুলেটর এবং ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরানো যায় এমন ওয়ার্কস্টেশন।
এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে একই উৎপাদন লাইনে বিভিন্ন মডেলের রোবট তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে নমনীয় রাখাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাজারে যাওয়ার আগে কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষা
কারখানা থেকে বের হওয়ার আগেই প্রতিটি রোবটকে একাধিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইউবিটেকের তথ্য অনুযায়ী, একটি সম্পূর্ণ হিউম্যানয়েড রোবটের ওপর চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পরীক্ষা চালানো হয়।
পরীক্ষায় রোবটের বিভিন্ন যান্ত্রিক ও কার্যকরী সক্ষমতা যাচাই করার পাশাপাশি এর বাহ্যিক গঠনও পরীক্ষা করা হয়। এজন্য ৩৬০ ডিগ্রি ভিজ্যুয়াল পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
মাত্র ৬৫ বর্গমিটারে ১১২ রোবট
রোবট তৈরির পর সেগুলো রাখার জন্যও কারখানাটিতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইউবিটেকের দাবি, তাদের ত্রিমাত্রিক স্বয়ংক্রিয় গুদামে মাত্র ৬৫ বর্গমিটার জায়গায় ১১২টি হিউম্যানয়েড রোবট সংরক্ষণ করা সম্ভব।
এখানে স্বয়ংক্রিয় গাইডেড ভেহিকল, চালকবিহীন ফর্কলিফটসহ বিভিন্ন লজিস্টিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব ব্যবস্থা উৎপাদন এলাকা, পরীক্ষার জায়গা ও গুদামের মধ্যে রোবট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ স্থানান্তর করে।
চীনে বাড়ছে রোবট উৎপাদনের গতি
হিউম্যানয়েড রোবটের এই নতুন কারখানা এমন সময়ে চালু হয়েছে, যখন চীনে শিল্প রোবটের উৎপাদনও দ্রুত বাড়ছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটিতে ৯৮ হাজার ৬৭৭টি শিল্প রোবট উৎপাদিত হয়েছে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এটি ৩০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শিল্প রোবট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫৬টি, যা এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
রোবট উৎপাদনের এই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি হিউম্যানয়েড রোবটের জন্য বড় আকারের উৎপাদনকেন্দ্র চালু হওয়ায় চীনের রোবট শিল্প নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লিউঝৌয়ের নতুন কারখানাটি সেই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তা হলো—রোবট শুধু উৎপাদনের ফলাফল নয়, উৎপাদনপ্রক্রিয়ারও একটি সক্রিয় অংশ। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কারখানায় মানুষ ও মেশিনের পাশাপাশি এক রোবটের তৈরি আরেক রোবটও শিল্প উৎপাদনের বাস্তব চিত্র হয়ে উঠছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















