কক্সবাজার সৈকতে হঠাৎ কেন বাড়ছে ভাঙন, এর পেছনের কারণ কি?

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৫৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত মানেই চোখজুড়ানো দীর্ঘ বালুচর। সমুদ্রের ঢেউ, বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি আর ঝাউগাছের সারি দেখতে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সৈকতের বিভিন্ন অংশে বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্য। কোথাও বালুচর সাগরে মিশে যাচ্ছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে বড় গর্ত ও খাল। আবার কোনো কোনো অংশে ঢেউ সরাসরি আঘাত করছে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধে।

এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও ঝাউগাছও। ফলে শুধু সৈকতের সৌন্দর্য নয়, পর্যটকদের হাঁটা ও গোসলের জায়গাও কমে আসছে।

সম্প্রতি লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে সৈকতের অন্তত ১৫টি স্থানে ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও জিও ব্যাগ ছিঁড়ে বালু বেরিয়ে গেছে, কোথাও নিচের বালু সরে গিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। আবার কোনো অংশে বালুচর কেটে দীর্ঘ খালের মতো আকৃতি নিয়েছে।

জিও ব্যাগে মিলছে না স্থায়ী সমাধান

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশার মতে, জোয়ারের প্রবল চাপের কারণে বিভিন্ন স্থানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু এ ধরনের কৃত্রিম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সৈকতের ভাঙন ঠেকানো কঠিন।

তাঁর মতে, সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠনেও গুরুত্ব দিতে হবে। সাগরলতা ও নিশিন্দার মতো উপকূলীয় উদ্ভিদ বালু ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। বালিয়াড়ি যত শক্তিশালী হবে, ঢেউয়ের সরাসরি আঘাত থেকে সৈকতকে তত বেশি প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল হকও বড় ঢেউ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে বাঁশ ও কাঠের খুঁটির মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে পরিকল্পনা।

পাঁচ বছরে কোথায় গেল বালুচর?

লাবণী পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে শামুক-ঝিনুকের ব্যবসা করেন বাহারছড়ার বাসিন্দা মফিজুর রহমান। তাঁর দাবি, গত পাঁচ বছরে তাঁর চোখের সামনেই সৈকতের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর সাগরের দিকে চলে গেছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন দশক আগে বর্তমান সৈকত থেকে সমুদ্র অনেক দূরে ছিল। পর্যটকদের বসার জন্য বালুচরের ওপর চেয়ার ও ছাতা বসানো হতো। এখন বালু ধীরে ধীরে সরে যাওয়ায় সমুদ্রের পানি অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। প্রতিবছর জিও ব্যাগ বসানো হলেও ভাঙনের গতি পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।

কক্সবাজার কিটকট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, লাবণী, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্টের কয়েকটি জায়গায় এখন ভাঙন ও বড় গর্ত দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে পর্যটকদের হাঁটা ও গোসলের জন্য প্রশস্ত বালুচর ছিল, অনেক জায়গায় এখন সেই পরিসর কমে গেছে।

ভোগান্তিতে পর্যটকেরাও

ভাঙনের প্রভাব শুধু সৈকতের ওপরই পড়ছে না, সমস্যায় পড়ছেন পর্যটকেরাও।

লাবণী পয়েন্টে ভাটার সময় দেখা যায়, জিও ব্যাগের পেছনে বসার জন্য চেয়ার রাখা হয়েছে। বালুচরের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও আবার লম্বা খাল তৈরি হয়েছে। এসব পার হয়ে পর্যটকদের সমুদ্রের পানির দিকে যেতে হচ্ছে।

তবে লাবণী থেকে দক্ষিণ দিকে সুগন্ধা পয়েন্টের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় একই সময়ে তুলনামূলক বেশি পর্যটক দেখা গেছে এবং সেখানে ভাঙনের মাত্রাও অন্য কিছু অংশের তুলনায় কম ছিল।

সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় ঢেউ সরাসরি জিও ব্যাগের বাঁধে আঘাত করছে। কোনো কোনো স্থানে পুরোপুরি জিও ব্যাগ সরে গেছে। কোথাও আবার কয়েক ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে এবং কোথাও ছেঁড়া ব্যাগ দিয়ে বালু বেরিয়ে আসছে।

পর্যটকদের উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সি-সেফ লাইফগার্ডের কর্মী মো. ফারুক ও জয়ানাল আবেদীনের পর্যবেক্ষণ, লাবণী থেকে উত্তরের ডায়াবেটিকস পয়েন্ট পর্যন্ত জিও ব্যাগ বসানোর পরও কয়েকটি স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রশিদের মতে, ভাঙনের কারণে শুধু বালুচর নয়, বালিয়াড়ির ঝাউগাছও একে একে সাগরে পড়ে যাচ্ছে।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা ফারজানা ইয়াসমিন জানান, বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে সৈকতের যে দৃশ্য দেখেছিলেন, বাস্তবে এসে কিছু জায়গায় তার সঙ্গে মিল পাননি। বালুচরে গর্ত এবং ছড়িয়ে থাকা জিও ব্যাগের কারণে শিশুদের নিয়ে হাঁটতে অসুবিধা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কুমিল্লার পর্যটক সাজ্জাদুল কবীরও সৈকতের গর্ত নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ভাঙন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় এর প্রভাব পড়তে পারে।

চেয়ার-ছাতা ব্যবসায়ী মো. আলমগীর বলেন, জোয়ারের সময় অনেক ক্ষেত্রে চেয়ার সরিয়ে জিও ব্যাগের পেছনে নিতে হয়। এতে পর্যটকেরা বসার জায়গা ব্যবহার করতে আগ্রহ হারান। পাশাপাশি জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে বড় পরিবর্তনের চিত্র

কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের পরিবর্তন নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়ে উপকূলের প্রায় ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি সমুদ্রের ক্ষয়ের শিকার হয়েছে। বিপরীতে পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে প্রায় ২৮৪ হেক্টর এলাকায়।

অর্থাৎ নতুন করে যে পরিমাণ ভূমি তৈরি হয়েছে, ক্ষয়ের পরিমাণ ছিল তার তুলনায় অনেক বেশি।

গবেষণায় উপকূলের এই পরিবর্তনের সঙ্গে ঢেউ, সমুদ্রস্রোত, জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকেও যুক্ত করা হয়েছে।

কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টিও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের করা এক গবেষণায় কক্সবাজারে বছরে গড়ে ৫ দশমিক ০৫ মিলিমিটার এবং মহেশখালীতে ৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়।

তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, ভূমির ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাওয়া, জোয়ারের ধরন এবং উপকূলের ভূ-আকৃতির পরিবর্তনের মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

ভাঙনের পেছনে একাধিক কারণ

২০২৪ সালে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের করা একটি পর্যালোচনায় কক্সবাজার সৈকতের ভাঙনের সঙ্গে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, উচ্চ জোয়ার, বড় ঢেউ এবং প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ক্ষয়ের মতো বিষয়কে যুক্ত করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা সৈকত রক্ষায় শুধু কংক্রিট বা জিও ব্যাগের মতো প্রকৌশলনির্ভর ব্যবস্থা নয়, প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ, উপকূলীয় উদ্ভিদ রোপণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধা প্রকৌশল ও প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ।

সমুদ্রবিজ্ঞানী ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক ড. আবদুল কাইয়ুমের মতে, দীর্ঘ সৈকতজুড়ে শুধু জিও ব্যাগ ব্যবহার করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সৈকতে বালি পুনঃস্থাপন, প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও সমুদ্রের আচরণ বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে গবেষণাগুলোতে উঠে এসেছে।

সামনে কী করা হতে পারে?

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদ পাশার মতে, বালিয়াড়ি উপকূলের একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাই শুধু কৃত্রিম বাঁধের ওপর নির্ভর না করে বালিয়াড়ি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. আয়াছুর রহমানও প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন করে জিও ব্যাগ ফেলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বালি পুনঃস্থাপন ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণের মতো পদ্ধতিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

সৈকতে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী ভাঙনরোধী প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কক্সবাজারের সৈকত শুধু বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি একটি সক্রিয় প্রাকৃতিক উপকূলীয় ব্যবস্থা। তাই ভাঙনকে শুধু সৈকতের বালু সরে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। সমুদ্রের পরিবর্তন, জলবায়ু, নদী ও সাগরের পলি, প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি এবং মানুষের কর্মকাণ্ড, সবকিছুর সমন্বিত প্রভাবই উপকূলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G