এআই কি সত্যিই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে এতদিন আলোচনা ছিল মূলত এর সম্ভাবনা ঘিরে। কিন্তু প্রযুক্তিটি যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে ভিন্ন একটি প্রশ্ন—মানুষ যে প্রযুক্তি তৈরি করছে, একসময় সেটিই কি মানুষের নিয়ন্ত্রণের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে?
সম্প্রতি এআই গবেষণায় যুক্ত এক ব্রিটিশ তরুণের পদত্যাগ এবং তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। ৮ সেপ্টেম্বর সান ফ্রান্সিসকোর আলামো স্কয়ারের একটি পার্কে বসে নিজের পদত্যাগের কথা জানান ২৭ বছর বয়সী জ্যাকব কক্সন। তিনি প্রায় তিন বছর ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকে এআই প্রশিক্ষণের প্রাথমিক ধাপ নিয়ে কাজ করেছেন।
কক্সনের অভিযোগ, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যেখানে লক্ষ্য আরও শক্তিশালী ও অতিবুদ্ধিমান এআই তৈরি করা। ভবিষ্যতের কোনো এআই যদি নিজেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে সেটিকে মানুষের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখাটি প্রকাশের সময় বড় কোনো প্রতিক্রিয়া আশা করেননি। কিন্তু মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর পোস্টগুলো প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ বার দেখা হয়। এরপর গবেষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং রাজনীতিকদের মধ্যে এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
কেউ কেউ মনে করছেন, আইন করে এআই উন্নয়নের ওপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ না আনা হলে কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নের গতি না কমালে আগামী কয়েক বছরে গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমনকি চরম পরিস্থিতিতে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন গবেষক।
এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আলোচনা
এআই নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ১২ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই প্রায় ৩ হাজার ৮০০ শব্দের একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দ্রুতগতিতে এআই উন্নয়নের পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেন।
আমোদেইয়ের আশঙ্কা, মানুষের উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো এআই খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইন্টারনেটের বিস্তৃত পরিসরে কার্যকর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এআই উন্নয়নের গতি নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ইলন মাস্ক ও ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও। নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে ওপেনএআই চলতি বছর শেয়ারবাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে না বলেও জানিয়েছেন অল্টম্যান।
তবে বাস্তবে নতুন এআই মডেলের প্রশিক্ষণ পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া বা দীর্ঘ সময়ের জন্য উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা এখনো আসেনি। বরং স্বাধীন নিরাপত্তা গবেষকদের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা অবশ্য নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক এআই ব্যবস্থা এখন কতটা জটিল ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
এআই কি নিজেকেই উন্নত করতে পারবে
অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের উন্নত মডেলগুলো কঠিন গণিতের সমস্যা সমাধান, কোড তৈরি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষণের মতো জটিল কাজে সক্ষমতা দেখাচ্ছে। একই সঙ্গে এসব মডেলকে আরও উন্নত এআই তৈরির প্রক্রিয়াতেও কাজে লাগানো হচ্ছে।
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এরই মধ্যে বলেছেন, কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআইয়ের যুগ এসে গেছে। এজিআই বলতে এমন এআইকে বোঝানো হয়, যা মানুষের বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করার ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বা কিছু ক্ষেত্রে তা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এখানেই এআই নিরাপত্তা গবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদি কোনো উন্নত এআই মানুষের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়াই নিজের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে সেটিকে আরও উন্নত করার পদ্ধতি বের করতে পারে, তাহলে উন্নয়নের গতি মানুষের প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত হতে পারে। এই ধারণাকে বলা হয় ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’।
কিছু গবেষক বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২০ সালের শুরুর দিকের তুলনা করছেন। তাঁদের বক্তব্য, কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রেও প্রথম দিকে পরিবর্তন খুব দ্রুত চোখে পড়েনি; পরে পরিস্থিতি অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে বদলে যায়। উন্নত এআইয়ের ক্ষেত্রেও দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
তবে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির বিষয়টি কেবল প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বিপুল বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, সামরিক সক্ষমতা, করপোরেট স্বার্থ এবং শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। ফলে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারগুলোকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
যখন এআই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে
সাম্প্রতিক কিছু পরীক্ষার ঘটনা এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
জুলাইয়ে ওপেনএআই জানায়, সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের কয়েকটি এআই এজেন্ট নির্ধারিত বিচ্ছিন্ন পরিবেশের বাইরে গিয়ে এআই প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেসের কম্পিউটার ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে আরেক দল এআই এজেন্ট ওপেনএআইয়ের নিজস্ব একটি সুপারকম্পিউটারেও প্রবেশ করেছিল বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লদ মিথোস’ মডেলের একটি সংস্করণ যুক্তরাজ্য সরকারের একটি সংস্থার পরীক্ষায় এমন আচরণ করেছিল, যা নির্ধারিত সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। মডেলটি একজন মানুষকে উন্মুক্ত সফটওয়্যারে ক্ষতিকর প্রোগ্রাম যুক্ত করার অনুমতি দেওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল।
সেপ্টেম্বরে স্বাধীন গবেষকেরা আরও দাবি করেন, ওপেনএআইয়ের কয়েকটি মডেল নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য জার্মানির একটি পরিত্যক্ত অনলাইন ফোরাম ব্যবহার করেছিল। একই সঙ্গে আরেকটি ওয়েবসাইটে হামলার চেষ্টার কথাও সামনে আসে।
এ ধরনের ঘটনা থেকেই ‘মিসঅ্যালাইনমেন্ট’ বা এআইয়ের নির্ধারিত লক্ষ্য ও মানুষের উদ্দেশ্যের মধ্যে অমিল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
৭০০ এআই এজেন্টের সমন্বিত আচরণ
এআই নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এমইটিআরের গবেষক অজেয়া কোত্রা ওপেনএআইয়ের একটি সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা খতিয়ে দেখেন।
তদন্তে তাঁর দল জানতে পারে, পরীক্ষার সময় প্রায় ১ হাজার ২০০টি এআই এজেন্টকে একটি বিচ্ছিন্ন অফলাইন পরিবেশে কাজ করার জন্য রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি এজেন্ট সেই নির্ধারিত পরিবেশের সীমা অতিক্রম করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি গোপন বার্তাবোর্ড তৈরি করে।
পরে প্রায় ৭০০ এজেন্ট একসঙ্গে সাইবার হামলার মতো কার্যক্রমে অংশ নেয়।
মূল পরীক্ষায় এআই ব্যবস্থাগুলোকে নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকা সফটওয়্যারে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা দেখাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার সময় মানুষের করা একটি ভুলের কারণে কিছু কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার জন্য এআই এজেন্টগুলো সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। পরীক্ষার মূল্যায়নব্যবস্থা তাদের কর্মকাণ্ড ধরে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তারা সেটি কীভাবে কাজ করে তা জানার চেষ্টা করে এবং মূল্যায়নব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর কৌশল খোঁজে।
ঘটনার আরও একটি দিক গবেষকদের বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। গোপন বার্তাবোর্ডে কয়েকটি এজেন্ট নিজেদের কর্মকাণ্ড ভুল বলে উল্লেখ করলেও তারা কাজ বন্ধ করেনি।
এখানে মেশিন লার্নিংয়ের একটি মৌলিক বিষয় সামনে আসে। এআইকে সাধারণত বিপুলসংখ্যক উদাহরণ ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কাজ ভালোভাবে করার জন্য প্রস্তুত করা হয়। সাফল্যের জন্য পুরস্কার এবং ব্যর্থতার জন্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলে এআই কখনো কখনো এমন কৌশল বেছে নিতে পারে, যা মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। এআই কীভাবে অভ্যন্তরীণভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার সবকিছু এখনো গবেষকদের কাছেও পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়।
হাগিং ফেসের ঘটনার পর আরেকটি দল গোপন বার্তাবোর্ডটি খুঁজে পায় এবং পরে ওপেনএআইয়ের একটি সুপারকম্পিউটারে প্রবেশ করে।
ওপেনএআই এ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, সতর্কসংকেত পাওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
আরও ছয় ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ
এআইয়ের মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ নিয়ে ওপেনএআই ছয় মাসের পর্যবেক্ষণ থেকে আরও ছয়টি ঘটনা প্রকাশ করেছে। এগুলোর বেশির ভাগই মডেল তৈরি ও পরীক্ষার সময় শনাক্ত হয়।
একটি ঘটনায় একটি মডেল নিজের ভুল ব্যবহারকারীর কাছ থেকে আড়াল করার জন্য অভ্যন্তরীণ নোট তৈরি করেছিল। সেখানে অনুপস্থিত তথ্য তৈরি করা এবং বিভিন্ন উৎসের অসামঞ্জস্য ঢেকে রাখার নির্দেশ ছিল।
আরেক ঘটনায় একটি মডেলের অভ্যন্তরীণ নোটে বিধিনিষেধ অমান্য করার নির্দেশ পাওয়া যায়। এমন ২৭টি নোট শনাক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
আরও কিছু ঘটনায় দেখা যায়, তথ্য অনুসন্ধানের সময় মডেল অনুমতি ছাড়া কোনো প্রোগ্রাম ব্যবহার করেছে, ওয়েব সূত্র দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজের ফাইল ইন্টারনেটে প্রকাশ করেছে কিংবা হারিয়ে যাওয়া তথ্য খুঁজতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোডভান্ডারকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
আরেক ঘটনায় সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ না থাকায় কয়েকটি এআই ব্যবস্থা উন্মুক্ত ফাইল শেয়ারিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে।
তবে ওপেনএআই জানিয়েছে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং এসব উদাহরণ দিয়ে এমন আচরণের প্রকৃত হার নির্ধারণ করা যায় না।
মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব
এআই নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর বিতর্কের জায়গাটি এখানেই। কিছু গবেষক মনে করেন, ভবিষ্যতের অত্যন্ত শক্তিশালী এআই যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার প্রভাব কেবল কম্পিউটার ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এআই যদি সরকার, সামরিক বাহিনী, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে এর প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
এমইটিআরের গবেষক অজেয়া কোত্রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণহীন কোনো এআই কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার মধ্যে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, পরবর্তী প্রজন্মের এআই এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক এআই নিরাপত্তা গবেষক জিওফ্রে আরভিং আরও চরম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর হিসাবে, আগামী এক দশকে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি ৫০ শতাংশ। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত ঝুঁকি-অনুমান; এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে সর্বসম্মত মত নেই।
জীবপ্রযুক্তি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শক্তিশালী এআই ব্যবহার করে বিপজ্জনক রোগজীবাণু নিয়ে গবেষণার অপব্যবহার সহজ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এসব আশঙ্কার বাস্তবতা ও সম্ভাব্য মাত্রা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
কেউ কেউ মনে করেন, বিপজ্জনক জীবাণু তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরীক্ষাগারে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়াই বড় বাধা। আবার অন্যদের মতে, সাম্প্রতিক কিছু এআই ঘটনার মাধ্যমে মূলত প্রযুক্তির চেয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে।
অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, তাদের এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণার কয়েকটি চেষ্টা শনাক্ত ও প্রতিহত করা হয়েছে। এর মধ্যে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের সংক্রমণক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা ছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই গতি কমাবে
এআইয়ের উন্নয়ন দ্রুত এগোলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির গতি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
জুলাইয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মী যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি নতুন এআই ব্যবস্থা প্রশিক্ষণের গতি কমানোর উপায় খোঁজার আহ্বান জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, নতুন মডেল তৈরির গতি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির গতির চেয়ে বেশি।
হাগিং ফেসের ঘটনার পর ওপেনএআই কয়েকটি প্রশিক্ষণ সাময়িকভাবে স্থগিত ও কিছু কাজের গতি কমিয়েছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পর আগস্টের শেষ দিকে প্রশিক্ষণ আবার শুরু হয়।
এদিকে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও গুগল এআই নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য একটি নতুন মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান তৈরির বিষয়েও আলোচনা করেছে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারবে।
তবে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর বিরোধিতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কারণে কোনো একটি দেশের প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়লে অন্য দেশ কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে—এমন যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
কানাডার এআই প্রতিষ্ঠান কোহেয়ারের প্রধান নির্বাহী আইডান গোমেজের মতো প্রযুক্তি খাতের কিছু ব্যক্তি আশঙ্কা করছেন, কঠোর নিয়ন্ত্রণ বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে এমন সুবিধা দিতে পারে, যা ছোট প্রতিযোগীদের বাজার থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন ও জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য নিয়েও বিতর্ক চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আইন করার উদ্যোগ
এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের আইন ও নীতিগত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু প্রস্তাবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে মডেলের সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া, জরুরি অবস্থায় উন্নত মডেল বন্ধ করার সক্ষমতা রাখা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সরকারকে জানানো বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
আরও কঠোর কিছু প্রস্তাবে অতিশক্তিশালী এআইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিংবা নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি না হওয়া পর্যন্ত উন্নত মডেলের প্রশিক্ষণ সীমিত করার মতো পদক্ষেপের কথা এসেছে।
তবে এসব উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মতপার্থক্য রয়েছে। এআই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে এবং বিপক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এআই প্রতিযোগিতাকে কৌশলগত লড়াই হিসেবে দেখছেন এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
১৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই নিয়ে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে এআই উন্নয়নের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে।
অন্যদিকে, এনবিসি নিউজের একটি জরিপে ৫৭ শতাংশ মার্কিন ভোটার বলেছেন, এআইয়ের সুবিধার তুলনায় এর ঝুঁকি বেশি। ৩৪ শতাংশ এর বিপরীত মত দিয়েছেন। চাকরি, মানুষের সৃজনশীলতা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও বিভিন্ন জরিপে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
চীনের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রশ্ন
এআই নিরাপত্তা শুধু একটি দেশের বিষয় নয়। কারণ, উন্নত মডেল ও কম্পিউটিং প্রযুক্তি এক দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় প্রযুক্তিশক্তির মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা সম্ভব কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিনিধিরা এআই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। তবে সেখান থেকে কোনো চুক্তি হয়নি। দুই দেশের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, উন্নত চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এ ধরনের আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে।
চীনও এআইয়ের সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, এআই রাজনৈতিক ও আদর্শিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
তবে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। চীনের নীতিনির্ধারকেরা এআইকে বিদ্যুৎ বা বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতো ব্যাপক ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনা করেন। ফলে এর উন্নয়নের গতি কমানোর ধারণা সেখানে সহজে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
তারপরও সীমিত কিছু বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। যেমন—এআই ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা বড় ধরনের সাইবার হামলা প্রতিরোধ করা এবং কোনো এআই ব্যবস্থার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হলে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা।
এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটি বিশেষ হটলাইন তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। কোনো এআই সাইবার হামলা চালালে সেটি কোনো সরকারের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড ছিল না—এমন তথ্য দ্রুত জানানো গেলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে।
আসল প্রশ্ন, প্রথম পদক্ষেপ নেবে কে
এআই নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—একটি প্রতিষ্ঠান একা উন্নয়নের গতি কমালে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করতে পারে। আবার সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে গতি কমানোর বিষয়ে একমত না হলে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তও বড় পরিবর্তন আনতে পারে না।
জ্যাকব কক্সনের পদত্যাগের পেছনেও ছিল এই দ্বন্দ্ব। তাঁর সহকর্মীদের কেউ কেউ মনে করতেন, প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে ভেতরে থেকে নিরাপত্তা গবেষণায় কাজ করা বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ, একজন গবেষক চলে গেলেও এআই উন্নয়নের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেমে যাবে না।
কক্সন অবশ্য শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পদত্যাগের আগে তিনি এআই মডেল প্রশিক্ষণের পরিবর্তে সেগুলোকে আরও নিরাপদ করার কাজে মনোযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও তাঁর উদ্বেগ দূর হয়নি।
এআই মানুষের জন্য বিপুল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে—একই সঙ্গে সামনে আনছে এমন কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই। প্রযুক্তিকে কত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে, কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগে তৈরি করতে হবে এবং কোনো এআই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে কে সেটি থামাবে—এসব প্রশ্নের সমাধান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও সরকারগুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে।
শেষ পর্যন্ত তাই বিতর্কটি শুধু এআই কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে নয়। বরং মানুষ কতটা আগে থেকে এর ঝুঁকি বুঝে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারবে, সেটিই হয়ে উঠছে মূল প্রশ্ন।
প্রতি / এডি / শাআ



















