কাবিননামায় বেশি দেনমোহর লেখা নিয়ে ইসলামের বিধান কী
বিয়ের সময় দেনমোহরের অঙ্ক নির্ধারণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তবে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা, বংশের আভিজাত্য কিংবা লোকদেখানো প্রতিযোগিতা থেকে কাবিননামায় বিপুল অঙ্কের দেনমোহর লিখে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কখনো কনের পক্ষ থেকে বড় অঙ্ক দাবি করা হয়, আবার কখনো বরপক্ষও মনে করে, দেনমোহর কেবল কাগজে-কলমে থাকার বিষয়—বাস্তবে হয়তো তা পরিশোধ করতে হবে না।
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। কাবিননামায় যে অঙ্কে দেনমোহর নির্ধারণ করে উভয় পক্ষ সম্মতি দেয়, সেটি শুধু আনুষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা নয়; বরং তা স্ত্রীর একটি স্বীকৃত আর্থিক অধিকার এবং স্বামীর ওপর একটি দায়।
দেনমোহর আসলে কার অধিকার
দেনমোহরকে অনেক সময় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার অংশ কিংবা কনের জন্য একটি উপহার হিসেবে দেখা হলেও ইসলামে এর অবস্থান ভিন্ন। এটি স্ত্রীর নিজস্ব অধিকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নারীদের তাদের নির্ধারিত মোহর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
দেনমোহরের অর্থ পাওয়ার অধিকার কেবল স্ত্রীর। তাঁর বাবা-মা, অভিভাবক কিংবা অন্য কোনো আত্মীয় স্বেচ্ছায় সেই অর্থ গ্রহণ বা মাফ করে দেওয়ার অধিকার রাখেন না। স্ত্রী নিজ ইচ্ছায়, কোনো ধরনের চাপ ছাড়া দেনমোহরের কোনো অংশ ছেড়ে দিলে সেটি আলাদা বিষয়।
অর্থাৎ, কাবিননামায় দেনমোহর নির্ধারণের পর সেটিকে পরিবারের সম্মান বা সামাজিক মর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সরাসরি স্ত্রীর আর্থিক পাওনা।
কাবিনে বড় অঙ্ক লিখলে দায়ও কি বড় হয়
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি বর ও কনে উভয় পক্ষ সম্মত হয়ে কাবিননামায় নির্দিষ্ট অঙ্কের দেনমোহর লিখে তাতে স্বাক্ষর করেন, তাহলে সেটিকে নিছক লোকদেখানো অঙ্ক হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ইসলামি ফিকহে চুক্তি ও তার শর্তের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি জেনে-শুনে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে সম্মতি দিয়ে পরে শুধু এই যুক্তি দেখাতে পারেন না যে, অঙ্কটি বাস্তবে পরিশোধ করার জন্য নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা দেখানোর উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল।
বিশেষ করে বিয়ের সময় কোনো গোপন সমঝোতায় কম অঙ্ক ঠিক করে প্রকাশ্য কাবিননামায় তার চেয়ে অনেক বেশি অঙ্ক লিখে স্বাক্ষর করার ঘটনা ঘটলে, লিখিত চুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফিকহের আলোচনায়ও প্রকাশ্যভাবে নির্ধারিত দেনমোহরের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই শুধু ‘লোকদেখানো’ বা ‘কাগজে লেখার জন্য’ বলা হয়েছিল—এমন দাবি করলেই দেনমোহরের দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় না।
পরিশোধের নিয়ত না থাকলে বিষয়টি আরও গুরুতর
দেনমোহর নির্ধারণের সময় সেটি পরিশোধ করার কোনো ইচ্ছাই না থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয়। কারণ, বিয়ের মাধ্যমে একজন নারীকে তাঁর প্রাপ্য আর্থিক অধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
হাদিসে এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে, যে দেনমোহর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিয়ে করে, কিন্তু শুরু থেকেই তা পরিশোধ করার নিয়ত রাখে না এবং স্ত্রীকে প্রতারিত করে।
মুসনাদে আহমাদের একটি হাদিসে দেনমোহর পরিশোধের নিয়ত না রাখা ব্যক্তির ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা বর্ণিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, দেনমোহরকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নেওয়া ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাকি দেনমোহর কি পরে মাফ হয়ে যায়
দেনমোহরের পুরো অর্থ বিয়ের সময় একসঙ্গে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক নয়। এর কিছু অংশ তাৎক্ষণিকভাবে এবং বাকি অংশ পরবর্তী সময়ে দেওয়ার জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তবে বাকি রাখার অর্থ দেনমোহর বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। বরং বিলম্বিত অংশ স্বামীর ওপর ঋণ হিসেবে থেকে যায়। স্ত্রী চাইলে নির্ধারিত সময় বা পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই পাওনা দাবি করতে পারেন।
এমনকি স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন একসঙ্গে সংসার করলেও বকেয়া দেনমোহরের দায় শেষ হয়ে যায় না। স্ত্রী স্বেচ্ছায় তা মাফ না করলে স্বামীর ওপর সেই পাওনা বহাল থাকে।
স্বামী মারা গেলে কী হবে
স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করেই মারা গেলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বকেয়া দেনমোহর তাঁর ওপর থাকা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের আগে মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে তাঁর দেনা পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনায় আসে।
ইমাম ইবনে কুদামাহ তাঁর ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করে মারা গেলে তাঁর সম্পদ থেকে দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে এবং এরপর উত্তরাধিকার বণ্টনের বিষয় আসে।
অর্থাৎ, কাবিনে বড় অঙ্ক লিখে পরে সেটি পরিশোধ না করে মৃত্যুবরণ করলেও দায় শেষ হয়ে যায় না।
তাহলে কি দেনমোহর যত বেশি, তত ভালো
দেনমোহরের ক্ষেত্রে শুধু অঙ্ক বড় করার প্রতিযোগিতাও ইসলামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমন অঙ্ক নির্ধারণ করা উচিত, যা বাস্তবসম্মত এবং স্বামীর পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব।
কারণ, দেনমোহর নির্ধারণের উদ্দেশ্য সামাজিক প্রতিযোগিতা তৈরি করা নয়; বরং নারীর একটি আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। সামর্থ্যের বাইরে অস্বাভাবিক অঙ্ক নির্ধারণ করে পরে তা পরিশোধের কোনো পরিকল্পনা না থাকা উভয় পক্ষের জন্যই সমস্যার কারণ হতে পারে।
হাদিসে বিয়েকে সহজ করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় এমন বিবাহকে বরকতময় বলা হয়েছে, যার খরচ ও দেনমোহর তুলনামূলকভাবে সহজ ও নাগালের মধ্যে থাকে।
কাবিনে স্বাক্ষরের আগে যা মনে রাখা জরুরি
দেনমোহরের অঙ্ক নির্ধারণের সময় তাই শুধু সামাজিক মর্যাদা বা আত্মীয়-স্বজনের চাপ বিবেচনা না করে বিষয়টির ধর্মীয় ও আর্থিক গুরুত্ব বোঝা প্রয়োজন। কাবিননামায় যে অঙ্ক লেখা হবে, তা বাস্তবে পরিশোধ করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
অন্যদিকে, কনের পক্ষেরও বোঝা উচিত—অবাস্তবভাবে বিশাল অঙ্ক লিখিয়ে নেওয়া শুধু কাগজে একটি সংখ্যা বাড়ানো নয়; এর সঙ্গে একজন মানুষের ওপর বাস্তব আর্থিক দায় তৈরি হয়।
দেনমোহর নারীর অধিকার, আবার সেই অধিকারকে সম্মান করে বাস্তবসম্মত অঙ্ক নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই লোকদেখানো অঙ্ক নয়, বরং উভয় পক্ষের সম্মতি, সামর্থ্য এবং ইসলামের বিধান বিবেচনা করেই দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিত।
প্রতি / এডি / শাআ























