স্কুলে এআই শিক্ষা চালুর উদ্যোগ, কতটা প্রস্তুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো?
স্কুল পর্যায়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি। কারণ এআইভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শুধু পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যুক্ত করলেই হবে না, প্রয়োজন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ এবং দক্ষ শিক্ষক।
দেশের অনেক স্কুলে এখনও এসব মৌলিক প্রযুক্তিগত সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। কোথাও কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও শিক্ষার্থীর তুলনায় কম্পিউটারের সংখ্যা কম। আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার অভাবে সেগুলোর পুরো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
এর পাশাপাশি রয়েছে মানব সক্ষমতার প্রশ্ন। শিক্ষকরা এআই সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পেলে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তিটির কার্যকর ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। একইভাবে শিক্ষার্থীদেরও এআইয়ের সুবিধা, সীমাবদ্ধতা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে বয়স উপযোগী ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
শুধু ডিভাইস দিলেই হবে না
এআই শিক্ষাকে কার্যকর করতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে ডিভাইস তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। শ্রেণি ও বয়স অনুযায়ী উপযোগী এআইভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী, বাংলা ভাষায় কনটেন্ট, নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
শিক্ষকদেরও জানতে হবে কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে, কোন ক্ষেত্রে এর ওপর নির্ভর করা উচিত নয় এবং এআইয়ের দেওয়া তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হবে। কারণ প্রযুক্তি থেকে পাওয়া সব তথ্য নির্ভুল নাও হতে পারে। তাই এআই ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতাও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করা জরুরি।
স্কুলভেদে প্রস্তুতির চিত্র জানা জরুরি
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশব্যাপী এআই শিক্ষা চালুর আগে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করা দরকার। কোন স্কুলে বিদ্যুৎ সুবিধা রয়েছে, কোথায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাওয়া যায়, কতগুলো কম্পিউটার সচল এবং কতজন শিক্ষক এআই ব্যবহারে প্রশিক্ষিত, এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
একই পদ্ধতিতে সব স্কুলে এআই শিক্ষা চালু করা হলে সুবিধা ও সীমাবদ্ধতার পার্থক্যের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে সহজেই আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পাবে, সেখানে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ছবি, পরিচয়, ফলাফল কিংবা অন্য ব্যক্তিগত তথ্য এআই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। তথ্য সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর শেখানোর পরিকল্পনা
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তি ও সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে সরকার। গত ৯ আগস্ট রাজধানীর বনানীতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ফাউন্ডেশনাল লার্নিং অ্যাকশন ট্র্যাকার’ অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, প্রাথমিকের কারিকুলামে ‘সায়েন্স টয়’ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের শুধু বইনির্ভর শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে হাতে-কলমে কাজ ও খেলাধুলার মাধ্যমে বিজ্ঞান শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ওই অনুষ্ঠানে তিনি জানান, প্রাথমিক শিক্ষায় বিজ্ঞান, গণিত, নকশা ও সৃজনশীলতার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি ‘ম্যাথ ল্যাব’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব ল্যাবে বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের গণিতের মৌলিক ধারণা শেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরা হয়। শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্মসহ বিভিন্ন সহায়তার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
অন্যান্য খাতেও এআই ব্যবহারের ওপর জোর
শিক্ষার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ২০ জুন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলসে চতুর্থ আন্তর্জাতিক টেক্সটাইল বিজ্ঞান ও প্রকৌশল সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন টেক্সটাইল খাতের উন্নয়নে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেক্সটাইল খাতে নেতৃত্ব দিতে গবেষণা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন উদ্ভাবনী ধারণা কাজে লাগানো প্রয়োজন।
‘এআই মহাসড়কে, আমরা এখনও ওঠার চেষ্টা করছি’
এআই শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, মানুষের দক্ষতা তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরী।
তার ভাষায়, এআই এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে, অথচ বাংলাদেশের অবস্থান এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। তার মতে, শুধু অবকাঠামো তৈরি করে এআই ব্যবহার শুরু করলেই হবে না, যারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তাদেরও প্রস্তুত করতে হবে।
শিক্ষায় এআই কোথায়, কীভাবে এবং কার জন্য ব্যবহার করা হবে, সেই পরিকল্পনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। এআইয়ের ব্যবহার প্রয়োজন হলেও এর প্রয়োগের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা
এআই ব্যবহারের সুযোগ সবার জন্য সমান না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাশেদা কে. চৌধূরীর মতে, যেসব শিক্ষার্থীর পরিবার বা প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সক্ষম এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা রয়েছে, তারা এআই ব্যবহারে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে যেতে পারে। বিপরীতে সীমিত সুবিধার শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
তার মতে, শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এআই ব্যবহারের বিষয়ে প্রস্তুত করা দরকার। প্রযুক্তিটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং এর সীমাবদ্ধতা কোথায়, সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এআই ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, প্রযুক্তি সম্পর্কে শুধু জানলেই হবে না, এর ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বুঝতে হবে। তা না হলে শিক্ষায় এআই নতুন সুযোগের পাশাপাশি বৈষম্য ও ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষতাও জরুরি
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হকের মতে, এআই শিক্ষা চালুর আগে প্রতিটি স্কুলের অবকাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, সচল কম্পিউটার এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সব মিলিয়ে স্কুল পর্যায়ে এআই শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সুবিধা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রস্তুতি। বয়স উপযোগী শিক্ষাসামগ্রী, বাংলা ভাষার কনটেন্ট, নিরাপদ এআই প্ল্যাটফর্ম, তথ্য সুরক্ষা এবং ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা নিশ্চিত করা না গেলে কেবল ডিভাইস ও ইন্টারনেট দিয়ে এআই শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে। তাই এআই শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
প্রতি / এডি / শাআ



















