নওগাঁয় লেমন গ্রাস চাষে বদলাচ্ছে কৃষকদের ভাগ্য
বাংলাদেশে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে চা একটি অপরিহার্য পানীয়। বাজারে বিভিন্ন ধরনের চা সহজেই পাওয়া গেলেও স্বাস্থ্যকর ও ভেষজ উপাদানসমৃদ্ধ চায়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সেই চাহিদার জায়গা থেকে নওগাঁয় বাণিজ্যিকভাবে লেমন গ্রাস চাষ এবং তা দিয়ে ভেষজ চা উৎপাদন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
লেমন গ্রাস একটি সুগন্ধি ভেষজ উদ্ভিদ, যা দেখতে অনেকটা ধানের মতো হলেও এর পাতা তুলনামূলক চওড়া ও লম্বা। পাতায় হাত বুলালেই লেবুর মতো সতেজ সুবাস পাওয়া যায়। এই পাতাই প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে হারবাল চা, যা স্বাদ ও সুগন্ধের পাশাপাশি নানা ভেষজ গুণের জন্যও পরিচিত।
নওগাঁর সীমান্তবর্তী সাপাহার উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহেল রানা তার প্রতিষ্ঠিত বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে বাণিজ্যিকভাবে লেমন গ্রাস চাষ করছেন। চাষের পাশাপাশি তিনি এই ঘাসের পাতা শুকিয়ে হারবাল চা হিসেবে বাজারজাত করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে তার উৎপাদিত চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে এসে লেমন গ্রাসের চা সংগ্রহ করছেন। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এই চায়ের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
নওগাঁ শহরের বাসিন্দা মাহমুদ রেজা বলেন, সংবাদমাধ্যমে লেমন গ্রাসের চায়ের বিষয়ে জানার পর তিনি নিজেই এসে এর স্বাদ নিয়েছেন। তার মতে, চা তৈরির সময় লেবুর মতো যে প্রাকৃতিক সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, তা পানীয়টিকে অন্যরকম সতেজতা দেয়। স্বাদ ভালো লাগায় তিনি বাড়ির জন্যও কিছু চা সংগ্রহ করেছেন। তবে আরও বেশি প্রচারণা হলে সাধারণ মানুষও এই চায়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন।
পোরশা উপজেলা থেকে আসা আরেক ক্রেতা পরেশ কুমার বলেন, ভেষজ গুণের কথা শুনেই তিনি লেমন গ্রাসের চা কিনতে এসেছেন। তার মতে, প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত এই চা সহজলভ্য হলে আরও বেশি মানুষ উপকৃত হবেন।
কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহেল রানা জানান, বিদেশ সফরের সময় তিনি প্রথম লেমন গ্রাসের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে ২০১৫ সালে ঢাকার একটি হর্টিকালচার কেন্দ্র থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজ বাড়িতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। এরপর প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন উৎস থেকে ধারণা নিয়ে তিনি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাতা শুকিয়ে লেমন গ্রাস টি প্রস্তুত করা হয় এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারজাত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সোহেল রানার ভাষ্য, বিশ্বের অনেক দেশে, বিশেষ করে চীন, জাপান ও থাইল্যান্ডে লেমন গ্রাস বিভিন্ন খাবার ও পানীয় তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত হয়। ভেষজ গুণের কারণে এটি স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও জনপ্রিয়। তবে স্বাস্থ্যগত উপকারিতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, একবার চারা লাগানোর পর একই গাছ থেকে বারবার নতুন কুশি বের হয় এবং নিয়মিত পাতা সংগ্রহ করা যায়। এছাড়া তুলনামূলক কম রাসায়নিক সার প্রয়োজন হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক ফসল হতে পারে।
তিনি জানান, নতুন উদ্যোক্তাদের আধুনিক ও লাভজনক কৃষিতে যুক্ত করতে কৃষি বিভাগ বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে জেলার আরও অনেক কৃষক লেমন গ্রাস চাষে আগ্রহী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নওগাঁ এখন শুধু ধানের জেলা নয়, লাভজনক ও বহুমুখী কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে যাচ্ছে। লেমন গ্রাসের মতো নতুন ফসলের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে জেলা প্রশাসন কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তার মতে, সঠিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে লেমন গ্রাস থেকে তৈরি ভেষজ চা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনাময় একটি পণ্য হয়ে উঠতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















