ভালুকার রেপটাইলস ফার্মে ৩৭০০ কুমির, কেমন চলছে খামারের কার্যক্রম
ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে ওঠা দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির প্রজনন খামার রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। প্রশাসনিক জটিলতা, একাধিকবার মালিকানা পরিবর্তন, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং করোনা মহামারির প্রভাব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় এই খামার এখন কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
প্রায় ১৫ একর জমির ওপর দুই দশকেরও বেশি আগে প্রতিষ্ঠিত খামারটি দেশের কুমির চাষ শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কয়েক দফা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
করোনা মহামারির সময় ব্যবসা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। সে সময় বিপুলসংখ্যক কুমির মারা যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কুমিরের চামড়া রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে খামারটি আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
খামার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি কুমির রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০টি প্রজননক্ষম এবং প্রায় ৩০০টি কুমিরের চামড়া সংগ্রহের উপযোগী। একটি কুমিরের চামড়া সংগ্রহের উপযোগী হতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে, আর পূর্ণ প্রজননক্ষম হতে প্রয়োজন হয় ১০ থেকে ১২ বছর।
যদিও খামারটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৪০ হাজার কুমির, বর্তমানে সেই সক্ষমতার তুলনায় কুমিরের সংখ্যা অনেক কম। প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার কুমির পালনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
রপ্তানি কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। ২০২২ সালে ৪০০টি কুমিরের চামড়ার একটি বকেয়া রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করা যায়নি। ২০২৩ সালের শুরুতে আরও ৫০০টি চামড়া রপ্তানির পরিকল্পনা থাকলেও সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয়েছিল।
খামারটি প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে ২০১৪ সালে। সে বছর জাপানে ৪৩০টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয়, যার মূল্য ছিল প্রায় দুই লাখ মার্কিন ডলার। ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া রপ্তানি করা হলেও তা বার্ষিক এক হাজার চামড়া রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে রপ্তানি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে একটি কুমিরের চামড়ার দাম সাধারণত ৬০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলার। এসব চামড়া দিয়ে বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, জুতা ও অন্যান্য ফ্যাশনপণ্য তৈরি করা হয়।
মালিকানা বদল ও আইনি জটিলতা
২০০২ সালে খামার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ২০০৪ সালে সরকারি অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েকবার মালিকানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
২০১২ সালে এটি নতুন মালিকানায় গেলেও ২০২০ সালে আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় সেই মালিকানা বাতিল হয়। এরপর দীর্ঘ সময় আইনি জটিলতায় খামারটির কার্যক্রম ব্যাহত থাকে। পরে আদালতের নির্দেশে একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালনা করা হয় এবং ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে নতুন মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমান মালিকপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন না থাকায় কুমিরের চামড়া রপ্তানি পুনরায় শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ প্রতিদিন কুমিরগুলোর খাদ্য, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়নি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কুমির শিল্প বাংলাদেশের জন্য লাভজনক রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
তাদের মতে, শুধু চামড়া নয়, কুমিরের হাড়, খুলি, নখ এবং অন্যান্য উপজাত থেকেও আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুমিরের মাংসেরও বড় বাজার রয়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও রপ্তানি অনুমোদন মিললে এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি কুমিরকে তিন বছর লালন-পালনে গড়ে প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার ব্যয় হয়, অথচ শুধু চামড়া বিক্রি করেই ৬০০ থেকে ৭০০ ডলার পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। উপজাত পণ্যের বাজার যুক্ত হলে প্রতিটি কুমির থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়া যেতে পারে।
তাদের মতে, দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, আন্তর্জাতিক সনদ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভালুকার এই কুমির খামার আবারও দেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে ফিরে আসতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ


















