শিশু সুরক্ষা মামলায় মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা

প্রকাশঃ আগস্ট ৮, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৩৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৩৫ অপরাহ্ণ

শিশুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে চলা মামলায় বড় ধরনের আর্থিক জরিমানার মুখে পড়েছে মেটা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের এক বিচারক প্রতিষ্ঠানটিকে ৫৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা, পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিচারক ব্রায়ান বিডশেইডের দেওয়া এই রায়ে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশু ও কিশোরদের ওপর যে ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সেটিকে ব্যাপক জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থের একটি অংশ ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি কমাতে গঠিত তহবিলে ব্যবহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই মামলায় এর আগে মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। নতুন অর্থদণ্ড যুক্ত হওয়ায় মামলাটিতে মেটার মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।

মেটার কার্যক্রমকে দূষণের সঙ্গে তুলনা

রায়ের ব্যাখ্যায় বিচারক মেটার ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, কারখানায় যেমন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দূষণ তৈরি হতে পারে, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন কনটেন্ট তার পণ্যের মতো কাজ করে এবং শিশুদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সেই ব্যবস্থার একটি গুরুতর পরিণতি।

বিচারকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণের ঝুঁকি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপরও পড়ছে।

মেটার মালিকানাধীন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডস।

আপিল করবে মেটা

রায়ের বিষয়ে মেটার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করার পরিকল্পনা করছে।

মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে কাজ করছে। ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের ক্ষেত্রে যে জটিলতা রয়েছে, সে বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটি স্বচ্ছ অবস্থান বজায় রেখেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অনলাইনে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া পদক্ষেপ নিয়েও মেটা আত্মবিশ্বাসী বলে জানিয়েছে।

এর আগে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের জরিমানার রায়ের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি একইভাবে আপিলের কথা জানিয়েছিল।

কী অভিযোগ ছিল মেটার বিরুদ্ধে

নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে ২০২৩ সালে কয়েকজন আইনজীবী মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম শিশুদের এমন কনটেন্ট ও যোগাযোগের মুখোমুখি করছে, যা তাদের যৌন শোষণসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

মামলার প্রথম পর্যায়ের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত দেখতে পায়, মেটা একাধিকবার নিউ মেক্সিকোর অন্যায্য ব্যবসায়িক চর্চা সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করেছে।

বিশেষ করে মেটার সুপারিশ ব্যবস্থা বা অ্যালগরিদম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর আগের কর্মকাণ্ড ও আগ্রহের ভিত্তিতে নতুন কনটেন্ট সাজিয়ে দেয়। এর ফলে কম বয়সী ব্যবহারকারীরা ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের দিকে আরও বেশি আকৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় যাবে বড় অংশের অর্থ

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জরিমানার অর্থের একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোরদের ওপর ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া ক্ষতির প্রভাব মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে।

এর মধ্যে প্রায় ৪২০ মিলিয়ন ডলার ক্লিনিক্যাল ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কর্মসূচিতে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণের জন্যও অর্থ বরাদ্দ করা হবে।

শিক্ষক ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে শিশুদের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

মেটাকে মানতে হবে একাধিক নতুন শর্ত

আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি মেটাকে শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে সুপারিশ না করা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের সরাসরি বার্তা পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করা।

এ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নগ্ন ছবি পাঠানো বা গ্রহণের বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে। যৌন শোষণের সঙ্গে যুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে ‘একবারেই নিষেধাজ্ঞা’ ধরনের নীতি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ের অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ‘লাইক’ সংখ্যার প্রদর্শন বন্ধ রাখা। স্কুলের ছুটির দিন ছাড়া সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাদের কাছে পুশ নোটিফিকেশন পাঠানোও সীমিত করতে হবে।

এ ছাড়া যেসব ব্যবহারকারী মাসে সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা, অর্থাৎ গড়ে দিনে প্রায় তিন ঘণ্টা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়াতেও বড় মামলা

মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে শিশু সুরক্ষা ও গোপনীয়তা নিয়ে একাধিক মামলা চলমান। এরই মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

শিশুদের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন ডজন অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সুরক্ষা নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে আইনি চাপ আরও বাড়ছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G