বাংলাদেশের দিকে নজর তিন পরাশক্তির
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে কেন্দ্র করে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বঙ্গোপসাগরের উপকূল, আন্তর্জাতিক নৌপথে অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভৌগোলিক সংযোগের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত নিজেদের স্বার্থ ও প্রভাব ধরে রাখতে বাংলাদেশকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই প্রতিযোগিতার নতুন মাত্রা দেখা যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তিন দেশের আগ্রহ আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত উপস্থিতি, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতেও ওয়াশিংটনের আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। ওই সমঝোতা অনুযায়ী আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তির একটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। এ ধরনের শর্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা এবং সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন প্রকল্পের কথা রয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীরগতির হলেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরেও দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়। একই সময়ে চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন চীনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
ভারতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপত্তা। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এবং প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ভারতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়ে। এর পাশাপাশি কূটনৈতিক টানাপোড়েন, ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধসহ নানা ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সুতা আমদানির বড় একটি অংশ ভারত থেকে আসে। পাশাপাশি ভারত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎও আমদানি করা হয়, যার আর্থিক মূল্য এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে চীনের প্রভাব সীমিত করতে আগ্রহী। বিপরীতে চীন অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। চীন ও ভারতের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাবও বাংলাদেশের ওপর পড়ছে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি দরকষাকষির সুযোগও সৃষ্টি করছে। তিন পক্ষের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ চাইলে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ আদায়ে তুলনামূলক শক্ত অবস্থান নিতে পারে। তবে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ কারণে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর প্রকল্প এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশি কোনো শক্তির সঙ্গে এমন সামরিক চুক্তি না করার বিষয়েও সতর্ক থাকার দাবি উঠছে, যা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ী ও সেন্ট মার্টিনের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ওপর বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার ক্ষেত্রে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে বাণিজ্যিক চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও বিস্তারিত আলোচনা ও জনসমক্ষে অবস্থান জানানো প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সরব অবস্থান দেখা গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। একই সময়ে বাংলাদেশে মার্কিন প্রতিনিধিদের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকও আলোচনায় এসেছে।
দেশের কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন, গণতান্ত্রিক অধিকারকর্মী এবং কিছু গবেষক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যিক সমঝোতার সমালোচনা করেছেন। তাদের বক্তব্য, চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা প্রকাশ্য আলোচনার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাবে বাংলাদেশের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা নিয়ে একদিকে নিরাপত্তার যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সীমিত সম্পদের দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু উন্নয়ন ও প্রবীণদের কল্যাণে আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের দাবি উঠছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন হলো, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অংশীদার না হয়ে কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কৌশলগত সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখাই হতে পারে ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
প্রতি / এডি / শাআ























