জ্বালানি সংকট সামাল দিতে বাড়ছে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ
দেশে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও জ্বালানি সংকট এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি অংশ পুনরায় চালু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি থাকায় সংকট মোকাবিলায় নতুন করে আরও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
শুক্রবার বিকেলে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনলাইন সভায় সরকার থেকে সরকার পদ্ধতিতে সৌদি আরবের কোম্পানি আরামকোর কাছ থেকে আরও এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভা সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ ও ১২ আগস্ট সরবরাহের জন্য কার্গোটির এলএনজি কেনা হবে। প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ দশমিক ৫৫ মার্কিন ডলার। একটি কার্গোতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকবে। সব মিলিয়ে কার্গোটির মূল্য পড়বে প্রায় ৭ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার।
দুই দিনে ৯ কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত
এর এক দিন আগে, বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরও আট কার্গো এলএনজি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমান থেকে দুটি করে মোট আট কার্গো এলএনজি কেনা হবে। এর সঙ্গে সৌদি আরব থেকে নতুন এক কার্গো কেনার অনুমোদন যুক্ত হওয়ায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে মোট নয় কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ছে
গত বৃহস্পতিবার ভোর ৩টা ১০ মিনিটের দিকে মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল থেকে পুনরায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। বর্তমানে ওই টার্মিনাল থেকে প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টার্মিনালের দ্বিতীয় বয়লার চালু করা সম্ভব হলে আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হতে পারে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর হলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বড়
দেশে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। মহেশখালীর টার্মিনালে দুর্ঘটনার আগে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একপর্যায়ে তা দৈনিক প্রায় ২১২ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বর্তমানে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুট হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ এখনো অনেক কম।
এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় চাপ কম থাকায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ভোগান্তি বাড়ছে।
গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে ভোগান্তি
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ লোডশেডিং হয়েছে বলে জানা গেছে।
গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে হবিগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকাতেও আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেড়েছে। মাহমুদাবাদ, অনন্তপুর, নিউ মুসলিম কোয়ার্টার, শ্যামলী, পিটিআই, রাজনগর ও কলেজ কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় রান্নার চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
অনেক পরিবারকে রাত গভীর হলে বা ভোরে রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে। কেউ কেউ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছেন।
জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানির হবিগঞ্জের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো. আলী আক্কাছ জানান, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়েও চাপ কমেছে। তবে সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির আশা করছেন তারা।
পেট্রোবাংলায় পরিচালনা পদে পরিবর্তন
এদিকে গ্যাস সংকটের মধ্যেই পেট্রোবাংলার উচ্চপর্যায়ে দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) পদে রদবদল করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার অফিস আদেশে প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামকে পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দপ্তরেই দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যদিকে একই দিনে পেট্রোবাংলার নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি শাখার পৃথক আদেশে পরিচালক (পিএসসি) পদে দায়িত্ব পালনকারী ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শোয়েবকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। পরে ওই পদে নিয়মিত নিয়োগ বা পদায়ন করা হলে তিনি নিজ দায়িত্বে ফিরে যাবেন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতি / এডি / শাআ























