একবার মিটার কিনেও কেন দিতে হয় আজীবন ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ
বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিল পরিশোধ করতে হবে, এতে আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও ডিমান্ড চার্জ এবং নিজের অর্থে মিটার স্থাপন করার পরও দীর্ঘদিন মিটার ভাড়া দিতে হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকেরা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, একটি মিটারের মূল্য পরিশোধের পরও মাসিক ভাড়া বন্ধ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এক বছর বা কয়েক বছর নয়, বিদ্যুৎ সংযোগ যতদিন চালু থাকে, ততদিনই মিটার ভাড়াও দিতে হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মিটারের মূল্যের তুলনায় ভাড়ার পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও এর স্থায়ী সমাধান হয়নি। বিশেষ করে ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটার চালুর পর বিদ্যুৎ বিলের বিভিন্ন খাত নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
গ্রাহকদের প্রধান প্রশ্ন হলো, মিটারের ক্রয়মূল্য উঠে যাওয়ার পরও কেন ভাড়া দিতে হবে। একইভাবে কোনো মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার না হলে কেন ডিমান্ড চার্জ দিতে হবে এবং এসব খাতে প্রতিবছর কত টাকা আদায় করা হচ্ছে, তার হিসাব কোথায় পাওয়া যাবে, সেই প্রশ্নও উঠছে।
মিটার ভাড়া কেন অনির্দিষ্টকাল
দেশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে ডিপিডিসি, ডেসকো, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, নেসকো ও ওজোপাডিকোর মতো প্রতিষ্ঠান। এসব সংস্থার আওতাধীন গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিটার ভাড়াও পরিশোধ করতে হয়।
গ্রাহকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ এনালগ, ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটারের দাম কয়েক হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনের গ্রাহকদের কেউ কেউ বছরের পর বছর মাসিক মিটার ভাড়া দিয়ে আসছেন।
ধরা যাক, মাসে ৪০ টাকা করে মিটার ভাড়া দিতে হলে ১০ বছরে একজন গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৪ হাজার ৮০০ টাকা। ২০ বছরে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় ৯ হাজার ৬০০ টাকা। অথচ এত বছর অর্থ দেওয়ার পরও মিটারের মালিকানা গ্রাহকের হাতে যায় না। সংযোগ চালু থাকা পর্যন্ত ভাড়াও চলতে থাকে।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, মিটারের ক্রয়মূল্য এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উঠে গেলে এরপরও একইভাবে ভাড়া নেওয়ার যৌক্তিকতা কী।
বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও ডিমান্ড চার্জ
ডিমান্ড চার্জ সাধারণত গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ কোনো মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে, শুধু তার ওপর এই চার্জ নির্ধারিত হয় না। অনুমোদিত লোডের বিপরীতে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
এর ফলে কোনো বাসা, দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ যুক্ত হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার শূন্য থাকলেও এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি হলো, গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও তার জন্য নির্দিষ্ট সক্ষমতা প্রস্তুত রাখতে হয়। সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার, বিদ্যুৎ লাইন, খুঁটি ও অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় অব্যাহত থাকে। ডিমান্ড চার্জ সেই ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের একটি অংশ হিসেবে নেওয়া হয়।
প্রিপেইড মিটারে আগেই কেটে নেওয়া হয় বিভিন্ন চার্জ
প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে গ্রাহক আগে টাকা জমা দেন, এরপর সেই অর্থ থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়া হয়। মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাটসহ অন্যান্য প্রযোজ্য অর্থ কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়।
ফলে কেউ ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলেও পুরো অর্থের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন না। ব্যালান্স শেষ হয়ে গেলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে রাতে বা জরুরি সময়ে ব্যালান্স শেষ হলে গ্রাহকদের সমস্যায় পড়তে হয়।
গ্রাহকদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রিপেইড ব্যবস্থায় রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা সহজভাবে বোঝার সুযোগ সীমিত। ফলে অর্থের হিসাব নিয়ে তাদের মধ্যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়।
মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জের অর্থ কোথায় যায়
বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয়। মিটার পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ লাইন মেরামত, সার্ভার, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে এসব অর্থ ব্যয় করা হয়। বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে আদায় করা প্রযোজ্য পাঁচ শতাংশ ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা।
তবে গ্রাহকদের প্রশ্ন, প্রতিবছর এসব খাত থেকে প্রতিটি বিতরণ কোম্পানি কত অর্থ আদায় করে এবং কত টাকা কোন কাজে ব্যয় করে, সেই তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য কতটা উন্মুক্ত।
এ ধরনের চার্জ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছায় নির্ধারণ করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ভিত্তিতেই হার কার্যকর হওয়ার কথা।
মিটার ভাড়া নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মিটারের মূল্য ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উঠে গেলে মাসিক ভাড়া বন্ধ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আরেকটি বিকল্প হতে পারে, এককালীন অর্থ নিয়ে মিটারের মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা।
স্মার্ট মিটারের ক্ষেত্রে সার্ভার ও তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়মিত ব্যয় প্রয়োজন হলে সেটির জন্য আলাদা ও যৌক্তিক সেবা ফি নির্ধারণ করা যেতে পারে। একইভাবে ডিমান্ড চার্জের ক্ষেত্রেও গ্রাহকের ধরন, সংযোগের অবস্থা এবং প্রকৃত ব্যবহারের বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
ক্যাবের প্রশ্ন, জবাবদিহি কোথায়
এ বিষয়ে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত বিল নিয়েও অনেক গ্রাহকের অভিযোগ রয়েছে। মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি ভ্যাট ও করও পরিশোধ করেন। তাই এসব অর্থ কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সেবা না পেলেও বিভিন্ন ধরনের বিল ও চার্জ পরিশোধ করতে হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিতরণ সংস্থার ব্যাখ্যা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক জানান, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ মূলত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানির হিসাবে জমা হয় এবং মিটার, বিদ্যুৎ লাইন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ব্যয়ের কারণে গ্রাহকের কাছ থেকে একই ধরনের অর্থ অনির্দিষ্টকাল আদায় করা কতটা যৌক্তিক এবং এর পূর্ণাঙ্গ হিসাব কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বিষয়টিকে গ্রাহকদের যৌক্তিক প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে পরে জানাবেন বলে তিনি জানান।
প্রতি / এডি / শাআ























