এবারের আয়করে বড় পরিবর্তন, আগের বছরের সঙ্গে পার্থক্যগুলো জেনে নিন
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় করদাতাদের অন্যতম প্রশ্ন থাকে, নতুন করবর্ষে আগের নিয়মই থাকবে কি না। ২০২৬-২৭ করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি করের ধাপ ও কয়েকটি হারে পরিবর্তন করা হয়েছে। সময়মতো রিটার্ন জমা দিলে কর-প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর-সংক্রান্ত পরিপত্র ও বাজেট নথিতে এসব পরিবর্তনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ল
সাধারণ করদাতাদের জন্য ২০২৫-২৬ করবর্ষে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত ছিল। নতুন করবর্ষে এই সীমা বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের তুলনায় আরও ৫০ হাজার টাকা আয় করের বাইরে থাকছে।
অন্যান্য শ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রেও করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাদের জন্য সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের জন্য তা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং গেজেটভুক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের বাবা-মা কিংবা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্যও অতিরিক্ত সুবিধা রয়েছে। নির্ধারিত করমুক্ত সীমার সঙ্গে প্রতিটি প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের জন্য আরও ৫০ হাজার টাকা যোগ হবে। বাবা ও মা দুজনেই করদাতা হলে তাঁদের মধ্যে একজন এই সুবিধা নিতে পারবেন।
করের ধাপেও বড় পরিবর্তন
নতুন করবর্ষে শুধু করমুক্ত আয়ের সীমা নয়, করের হারেও পরিবর্তন এসেছে।
২০২৫-২৬ করবর্ষে করমুক্ত সীমার পরের ১ লাখ টাকা আয়ের ওপর ৫ শতাংশ কর দিতে হতো। ২০২৬-২৭ করবর্ষে এই ধাপটি বদলে পরবর্তী ৩ লাখ টাকা আয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পরের ৪ লাখ টাকা আয়ে ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকায় ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকায় ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এর পরের যেকোনো আয়ের ওপর করহার ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়লেও প্রথম করযোগ্য ধাপের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে কারও আয় করমুক্ত সীমার কাছাকাছি হলে সুবিধা মিলতে পারে, আবার তুলনামূলক বেশি আয় করা কিছু করদাতার মোট করের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় বাড়তে পারে।
নতুন করে যুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ শ্রেণি
২০২৬-২৭ করবর্ষে আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আলাদা করসুবিধা রাখা হয়েছে। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত থাকবে।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাবা-মা বা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্যও আগের তুলনায় বিশেষ সুবিধা বহাল রয়েছে।
সময়মতো রিটার্ন দিলে কর-প্রণোদনা
নতুন করব্যবস্থায় নির্ধারিত সময়ের শুরুতেই রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের করদাতারা পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর-প্রণোদনা পাবেন। তবে এ সুবিধার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের প্রথম তিন মাসের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতার জন্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকছে।
দেরিতে রিটার্ন দিলে বাড়বে কর
১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে আগের প্রণোদনা পাওয়া যাবে না। এরপর সময় আরও পেরিয়ে গেলে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি, অতিরিক্ত হিসেবে দিতে হবে।
আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হবে।
সারা বছর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ
নতুন ব্যবস্থায় করদাতারা অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। তবে কখন রিটার্ন দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর কর-প্রণোদনা বা অতিরিক্ত করের বিষয়টি নির্ভর করবে।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা, যেটি কম, সেই পরিমাণ প্রণোদনা পাওয়া যাবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে শুধু নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে হবে।
জানুয়ারি থেকে মার্চে রিটার্ন দিলে ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি, অতিরিক্ত কর হিসেবে দিতে হবে। এপ্রিল থেকে জুনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত করের হার হবে ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি।
অনলাইনেও দেওয়া যাচ্ছে রিটার্ন
২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের ই-রিটার্ন সেবা ২২ জুলাই ২০২৬ থেকে চালু করেছে এনবিআর। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর পরিশোধের সুবিধাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়লেও করের প্রথম ধাপের হার ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি সময়মতো রিটার্ন দিলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে নিজের মোট আয়, করযোগ্য আয় এবং প্রযোজ্য করের ধাপগুলো ভালোভাবে হিসাব করে নেওয়া জরুরি।
প্রতি / এডি / শাআ























