পৃথিবীর বয়স কত, যেভাবে জানা গেল সেই রহস্য
জন্মদিন মানেই বয়সের সঙ্গে আরও একটি বছর যোগ হওয়া। শিশুরা তাই জন্মদিন নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। আবার বয়স বাড়াকে কেউ কেউ জীবনের আরও একটি বছর পেরিয়ে যাওয়ার হিসাব হিসেবেও দেখেন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, মানুষের নয়, আমাদের এই পৃথিবীর বয়স কত?
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৫ কোটি বছর। সংখ্যাটি শুনতে সহজ হলেও এর ব্যাপ্তি কল্পনা করা বেশ কঠিন। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বই যেখানে প্রায় ৩ লাখ বছরের, সেখানে কৃষিকাজের মাধ্যমে স্থায়ী বসতি ও সভ্যতার বিকাশ শুরু হয়েছে আনুমানিক ১২ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি অত্যন্ত সামান্য।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কয়েক শ কোটি বছর আগের পৃথিবীর বয়স বিজ্ঞানীরা জানলেন কীভাবে?
পৃথিবীর বয়স নিয়ে মানুষের কৌতূহল অবশ্য নতুন নয়। মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর উৎপত্তি নিয়ে নানা সভ্যতায় বিভিন্ন ধরনের ধারণা প্রচলিত ছিল। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনে করতেন, মহাবিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট সূচনা নেই। এটি চিরকাল ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ফলে পৃথিবীর বয়স নির্দিষ্ট করে বের করার প্রয়োজনীয়তা তাঁর চিন্তায় ছিল না।
পরবর্তীতে ধর্মীয় ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করেও পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। বাইবেলে উল্লেখ থাকা বিভিন্ন রাজা ও বংশের সময়কাল যোগ করে কয়েকজন খ্রিষ্টান ধর্মতাত্ত্বিক পৃথিবীর বয়স প্রায় ৬ হাজার বছর বলে ধারণা করেন। ১৭ শতকে আইরিশ আর্চবিশপ জেমস আশার আরও নির্দিষ্ট হিসাব দিয়ে দাবি করেছিলেন, পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০৪ সালের ২২ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায়।
আধুনিক বিজ্ঞানের হাত ধরে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের চেষ্টা অবশ্য অন্য পথে এগোয়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে নজর দেন পৃথিবীর শিলাস্তরের দিকে।
পাহাড়, পাথর ও অন্যান্য শিলা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষয় হয়ে ছোট কণায় পরিণত হয়। এসব কণা পানি, বাতাস বা অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এক জায়গায় জমা হতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে জমতে জমতে তৈরি হয় পলির স্তর। পরবর্তী সময়ে এসব স্তর শক্ত হয়ে শিলাস্তরে পরিণত হয়। একটির ওপর আরেকটি স্তর জমতে জমতে তৈরি হয় বহুস্তরীয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো।
১৭ শতকে ডেনিশ বিজ্ঞানী নিকোলাস স্টেনো এসব স্তর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা দেন। তাঁর মতে, কোনো এলাকায় স্বাভাবিকভাবে শিলাস্তর তৈরি হলে সাধারণত নিচের স্তরটি ওপরের স্তরের তুলনায় পুরোনো হয়। এই নীতিই পরে ‘ল অব সুপারপজিশন’ নামে পরিচিত হয়।
এর ফলে বিজ্ঞানীরা অন্তত দুটি শিলাস্তরের কোনটি তুলনামূলকভাবে পুরোনো আর কোনটি নতুন, তা বোঝার একটি পদ্ধতি পান। তবে এতে কোনো শিলার নির্দিষ্ট বয়স জানা যাচ্ছিল না।
১৯ শতকে ভূতত্ত্ববিদ চার্লস লায়েল শিলাস্তর তৈরির গতি পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর বয়স সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা করেন। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কত পরিমাণ পলি জমা হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে শিলাস্তরের পুরুত্ব কত, তা তুলনা করে তিনি অনুমান করেন যে পৃথিবীর বয়স কয়েক শ মিলিয়ন বছরেরও বেশি হতে পারে।
তবে এরপর পদার্থবিজ্ঞানের একটি হিসাব ভূতত্ত্ববিদদের ধারণাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
পৃথিবীর বয়স হিসাব করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একসময় ধরে নেন, পৃথিবী হয়তো শুরুতে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায় ছিল। সময়ের সঙ্গে তাপ হারাতে হারাতে এর বাইরের অংশ ঠান্ডা হয়ে বর্তমানের কঠিন ভূত্বক তৈরি হয়েছে।
এই ধারণার পেছনে কিছু পর্যবেক্ষণও ছিল। খনিতে যত গভীরে যাওয়া হয়, তাপমাত্রা সাধারণত তত বাড়তে দেখা যায়। আবার আগ্নেয়গিরি থেকে বের হওয়া উত্তপ্ত লাভাও পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড তাপের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
ফরাসি বিজ্ঞানী জর্জ লুই ল্যক্লের্ক বিভিন্ন ধাতব গোলক উত্তপ্ত করে সেগুলো ঠান্ডা হতে কত সময় লাগে, তা পরীক্ষা করেছিলেন। এরপর পৃথিবীর মতো বড় একটি উত্তপ্ত গোলক ঠান্ডা হয়ে বর্তমান অবস্থায় আসতে কত সময় লাগতে পারে, তা অনুমান করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স ছিল মাত্র কয়েক দশ হাজার বছর।
পরে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন তাপগতিবিদ্যার সূত্র ব্যবহার করে একই ধরনের হিসাব আরও উন্নত করেন। বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর অনুমান পরিবর্তিত হলেও শেষদিকে তিনি পৃথিবীর বয়স কয়েক কোটি বছরের মধ্যে বলে মত দেন।
এই হিসাব ভূতত্ত্ববিদদের কাছে সমস্যাজনক ছিল। কারণ শিলাস্তরের বয়স ও পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্যের বিকাশ সম্পর্কে তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছিল, পৃথিবীর ইতিহাস এর চেয়ে অনেক দীর্ঘ। বিশেষ করে বিবর্তনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন প্রজাতির পরিবর্তন ও বৈচিত্র্য গড়ে উঠতে বিপুল সময় প্রয়োজন।
সমস্যাটির সমাধান আসে এমন একটি আবিষ্কার থেকে, যা কেলভিনের হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।
১৮৯৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। পরবর্তী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা তেজস্ক্রিয় মৌল ক্ষয়ের সময় তাপ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ পৃথিবী শুধু বাইরে থেকে ঠান্ডা হয়ে আসেনি, এর ভেতরেও দীর্ঘ সময় ধরে তাপ উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া চলেছে।
কেলভিনের হিসাবের সময় এই অভ্যন্তরীণ তাপের উৎস বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে তাঁর অনুমান করা পৃথিবীর বয়স প্রকৃত বয়সের তুলনায় অনেক কম হয়ে গিয়েছিল।
তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কার পৃথিবীর বয়স নির্ধারণে নতুন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দরজা খুলে দেয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় রেডিওমেট্রিক ডেটিং।
সহজভাবে বললে, কিছু তেজস্ক্রিয় মৌল সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে অন্য মৌলে রূপান্তরিত হয়। কোনো নমুনায় মূল তেজস্ক্রিয় মৌল কতটা অবশিষ্ট আছে এবং তার ক্ষয়ের ফলে তৈরি হওয়া মৌলের পরিমাণ কত, তা জানা গেলে সেই নমুনাটি কত পুরোনো হতে পারে, তা হিসাব করা সম্ভব।
এই হিসাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘অর্ধায়ু’। কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থের অর্ধেক পরমাণু ক্ষয় হয়ে যেতে যে সময় লাগে, সেটিই তার অর্ধায়ু। বিভিন্ন মৌলের অর্ধায়ু ভিন্ন। যেমন কার্বন-১৪-এর অর্ধায়ু প্রায় ৫ হাজার ৭৩০ বছর।
তবে পৃথিবীর মতো কোটি কোটি বছরের পুরোনো কোনো বস্তুর বয়স নির্ণয়ে কার্বন-১৪ যথেষ্ট নয়। এত দীর্ঘ সময়ের জন্য বিজ্ঞানীদের এমন তেজস্ক্রিয় মৌল প্রয়োজন, যার অর্ধায়ু অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের মতো মৌলের নির্দিষ্ট আইসোটোপ বিশেষভাবে কার্যকর।
তবে রেডিওমেট্রিক ডেটিংও খুব সরল কোনো হিসাব নয়। একটি তেজস্ক্রিয় মৌল ক্ষয় হয়ে যে নতুন মৌল তৈরি করে, সেটিও কখনো তেজস্ক্রিয় হতে পারে। ফলে একটি মৌল থেকে আরেকটি মৌলে যাওয়ার মাঝখানে একাধিক ধাপ থাকতে পারে। পুরো ক্ষয়-শৃঙ্খল এবং নমুনার রাসায়নিক ও ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, যে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে সেটি যেন তার গঠনের পর থেকে প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। বাইরে থেকে নতুন পদার্থ ঢোকা বা পুরোনো উপাদান বেরিয়ে গেলে বয়সের হিসাবেও ভুল আসতে পারে।
এই কারণেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো শিলা ও অন্যান্য প্রাচীন নমুনা খুঁজতে থাকেন। কিন্তু পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলার বয়স জানলেই যে পৃথিবীর জন্মের সময়টি নিখুঁতভাবে জানা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর একেবারে আদিম শিলার অনেকটাই সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বা ধ্বংস হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আরও নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে উল্কাপিণ্ডের দিকে নজর দেন। সৌরজগতের গঠনের প্রাথমিক সময়ের অবশিষ্ট নমুনা হিসেবে এসব উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর বয়স নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৫০-এর দশকে মার্কিন ভূরসায়নবিদ ক্লেয়ার প্যাটারসন উল্কাপিণ্ডের সীসা-আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর বয়সের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হিসাব দেন। তাঁর নির্ণয় অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৫ কোটি বছর।
পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও বিভিন্ন নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই হিসাব পরীক্ষা করা হয়েছে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণাতেও পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ থেকে ৪৫৫ কোটি বছর বলে ধরা হয়।
এই বিশাল সময়কে মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। পৃথিবীর প্রায় ৪৫৫ কোটি বছরের ইতিহাসে আধুনিক মানুষের উপস্থিতি একেবারেই সাম্প্রতিক ঘটনা। আমাদের সভ্যতার কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস সেই মহাকালের তুলনায় যেন মুহূর্তেরও কম।
তবু সেই অতি ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যেই মানুষ এমন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর বয়স সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের এই দীর্ঘ যাত্রা তাই শুধু একটি সংখ্যা খুঁজে বের করার গল্প নয়, বরং মানুষের কৌতূহল, পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অসাধারণ সাফল্যের গল্প।
প্রতি / এডি / শাআ



















