তিন দশক পেরিয়ে গেলেও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি ভোলার গ্যাস
দেশের গ্যাস সংকটের মধ্যে দীর্ঘ ৩১ বছর পর ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ আবারও জোরালো হয়েছে। ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি খুলনা হয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলেও সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পাইপলাইন নির্মাণ শেষ করতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
১৯৯৫ সালে গ্যাসের সন্ধান, এখনো গ্রিডের বাইরে
ভোলার বোরহানউদ্দিন এলাকায় ১৯৯৫ সালে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানকার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে ভোলা থেকে গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা হলেও প্রকল্পটি এগোয়নি। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভোলা-বরিশাল হয়ে ঢাকায় গ্যাস নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয় এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। সেটিও শেষ পর্যন্ত স্থবির হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটে নতুন করে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, ভোলার গ্যাস স্থলভাগে আনার জন্য সম্ভাব্যতা জরিপ ও দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। ভোলায় এখন পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে এবং প্রতিটি কূপেই গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। আশপাশের উপকূলীয় এলাকাতেও আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নদীর নিচ দিয়ে পাইপলাইন, বাড়বে খরচ
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার লাইন প্রয়োজন হতে পারে। এর একটি বড় অংশ নদীপথের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করতে হবে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় সাধারণ স্থলভাগের পাইপলাইনের তুলনায় বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তুলনার জন্য সংশ্লিষ্টরা চট্টগ্রাম-ফৌজদারহাট-বাখরাবাদ ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮১ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রকল্পের উদাহরণ দিচ্ছেন। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নির্মিত ওই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়েছিল প্রায় ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
তবে ভোলা-বরিশাল-খুলনা প্রকল্পের ক্ষেত্রে নদী পারাপার, নির্মাণ জটিলতা এবং বর্তমান সময়ে ডলারের মূল্যসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
ভোলায় কত গ্যাস রয়েছে?
ভোলার ভোলা ইস্ট ও ভোলা নর্থসহ আশপাশের এলাকায় উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব ক্ষেত্রে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে। সবগুলো কূপ থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস উত্তোলন করা গেলে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব।
এর মধ্যে পাঁচটি কূপ বর্তমানে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। বাকি চারটির মধ্যে একটি কূপের পাইপলাইন এবং অন্য তিনটির প্রসেস প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ চলছে।
এ ছাড়া ভোলায় আরও ১০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)।
চাহিদা না থাকায় গ্যাসের বড় অংশ অব্যবহৃত
পাইপলাইন না থাকায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে গ্যাসের চাহিদাও সীমিত। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন ১০টি কূপ থেকে প্রতিটি গড়ে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস পাওয়া গেলে দৈনিক আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন সম্ভব হবে। বর্তমানে অব্যবহৃত গ্যাসসহ ভবিষ্যতে ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন কূপ খননের প্রস্তুতি
বাপেক্স ভোলায় নতুন ১০টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ভোলা নর্থ-৫, ভোলা নর্থ-৬, ভোলা নর্থ-৭, শাহবাজপুর-৯ এবং শাহবাজপুর-১০-এর জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। আরও পাঁচটি কূপ খননের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কূপগুলোতে প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া গেলে ভোলার গ্যাস জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পেট্রোনাসের সঙ্গে সহযোগিতার আশাবাদ
ভোলার গ্যাস নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী।
তিনি জানান, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং পেট্রোনাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠকও হয়েছে। বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়া সফর করেছে বলেও জানান তিনি।
পাঁচ বছর আগে উদ্যোগ নিলে সংকট কমত
বাপেক্সের কর্মকর্তাদের মতে, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার উদ্যোগ আরও আগে বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান গ্যাস সংকটের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমামের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভোলার গ্যাস নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তব কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাইপলাইন নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় এখন কাজ শুরু করলেও গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
আগের বিকল্প উদ্যোগও টেকেনি
ভোলার গ্যাস ব্যবহারের জন্য এর আগে পাইপলাইনের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস সংকুচিত করে সিএনজি আকারে সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ভোলা থেকে গ্যাস নিয়ে গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পকারখানায় সরবরাহ করেছিল।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভোলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আকারে পরিবহনের পরিকল্পনাও সামনে আসে। এ জন্য গ্যাসের পরিবহনমূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে পরিবহন ব্যয় প্রতি ঘনমিটারে তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেই উদ্যোগও আর এগোয়নি।
কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন
দেশের গ্যাস সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন কমে যাওয়াকে দেখা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের দিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছে।
দেশের অন্যতম বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একসময় এখান থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও ২ সেপ্টেম্বর উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ৭৩৩ মিলিয়ন ঘনফুটে।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বিশাল
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ মিলছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সরবরাহের মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার হিসাবে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
এই পরিস্থিতিতে ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা গেলে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন, দরপত্র এবং দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের ধাপগুলো দ্রুত শেষ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতি / এডি / শাআ























