বাংলাদেশে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়?
ব্যাংক থেকে সামান্য অঙ্কের ঋণ নিয়ে কিস্তি পরিশোধে দেরি হলে গ্রাহকের কাছে নোটিশ যায়, ফোন আসে, এমনকি মামলা পর্যন্ত গড়াতে পারে। অথচ বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর পরিশোধ না করা বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় পুনঃতফসিল, সময় বাড়ানো কিংবা বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ নিয়ে বিতর্কের বড় একটি জায়গা তৈরি হয়েছে এই বৈপরীত্যকে ঘিরেই।
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত দেড় দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১ হাজার কোটি টাকায়।
এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছানোর তথ্য সামনে এসেছে। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের বোঝা কয়েক গুণ বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের পরও ঋণখেলাপির পরিমাণ কমার বদলে বাড়ছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট বিতরণ করা ঋণের তুলনায় এর অংশও উল্লেখযোগ্য।
কঠোর ব্যবস্থা নাকি নতুন করে সুযোগ?
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে আদায়ের ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে কিছু বড় ঋণগ্রহীতাকে ঋণ পুনর্গঠন ও পরিশোধের জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়ার নীতিও গ্রহণ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো, বহু বছর ধরে আদালতে মামলা চালিয়ে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করার চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাকে ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ দিলে দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুর্বল অবস্থায় খেলাপি ঋণের টাকা উদ্ধারে সহজ কোনো পথ নেই। ফলে পুনঃতফসিল বা সময় বাড়ানোর মতো ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের কঠোরতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
তাদের আশঙ্কা, ঋণ দেওয়ার সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই ও নজরদারি নিশ্চিত না হলে নতুন করে একই ধরনের সংকট তৈরি হবে।
খেলাপি ঋণ বাড়ল কেন?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।
এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া, ব্যাংক পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে দুর্বল তদারকি এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালকদের স্বার্থের সংঘাত।
গত দুই দশকে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যাংককে ঘিরে একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় বড় অঙ্কের ঋণ আটকে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু অনেক ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় সংস্থান করতেও সমস্যায় পড়ছে। এতে তাদের তারল্য পরিস্থিতি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অন্য দেশে খেলাপিদের ক্ষেত্রে কী হয়?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় ঋণখেলাপিদের নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ পরিশোধের ইতিহাস একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ঋণ পাওয়ার সক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। চীনে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভারতে বড় ঋণগ্রহীতা কোনো কোম্পানি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ‘Insolvency and Bankruptcy Code’-এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ বিক্রি করে পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া চালানো যেতে পারে।
বাংলাদেশেও অর্থঋণ আদালতসহ ঋণ আদায়ের জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের মতে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করে না, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
মামলার দীর্ঘসূত্রতাও বড় সমস্যা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাধা। অর্থঋণ আদালতে কোনো মামলা নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
ফলে অনেক ব্যাংক বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে মামলা করতেও অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। কারণ মামলা চলাকালে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে ওই ঋণের প্রভাব পড়ে এবং আদায় না হওয়া অর্থ দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
আর বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি জড়িত থাকায় সরকার বা ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে অনীহা থাকে।
ফলে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার যুক্তিতে ঋণ পুনঃতফসিল কিংবা অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সুযোগ কখনো কখনো রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহল ব্যবহার করে থাকে।
বেসরকারি ব্যাংকিং খাতেও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান ঋণ পাওয়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য নতুন সুবিধা
খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়ে নীতিগত ব্যবস্থা নিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানকে পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিশোধ শুরুর আগেও গ্রেস পিরিয়ড রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
এর আগে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য নগদ অর্থ জমা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা, দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর সাম্প্রতিক বিভিন্ন চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, সুদের হার বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক বিক্রি কমে যাওয়াও এর মধ্যে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকটি যুক্তি হলো, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় বহু বছর অপেক্ষা করার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে ঋণের একটি অংশ দ্রুত উদ্ধার করা গেলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি উন্নত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু থাকলে কর্মসংস্থানও বজায় থাকবে।
ছাড়ের সুফল নিয়ে প্রশ্ন
তবে বড় ঋণখেলাপিদের দীর্ঘ সময় ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো সম্ভব হলেও বাস্তবে ব্যাংকের হাতে কত টাকা ফিরে আসবে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
এছাড়া যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন, তাদের সঙ্গে খেলাপিদের জন্য একই ধরনের সুবিধা দেওয়ায় ভালো ঋণগ্রহীতারা ভবিষ্যতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতাও উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নীতিগত সুবিধা যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে এর অপব্যবহার করে কোনো কোনো ঋণগ্রহীতা আরও বড় খেলাপিতে পরিণত হতে পারেন।
তাহলে সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা সময় বাড়িয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
তাদের পরামর্শ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অর্থঋণ আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।
কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ খেলাপিদের নতুন করে ব্যবসা বা ঋণ নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রেও কার্যকর তদন্তের পরামর্শ দিচ্ছেন।
তবে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ব্যাংকগুলোর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ খেলাপি ঋণের পরিমাণ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে কয়েক লাখ কোটি টাকার এই সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বড় আকার নিতে পারে। ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে তাই একদিকে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে কঠোর জবাবদিহি ও শাস্তি।
প্রতি / এডি / শাআ























