‘বাংলাদেশ পথ দেখিয়েছে’, ভারতেও সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র দেখছে বিজেপি

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৫, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ

‘বাংলাদেশ আমাদের পথ দেখিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন দিল্লির ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দাবি করেছে, এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারতে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। তবে নেহা বোরার বক্তব্যকে বিজেপির পক্ষ থেকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সেটি দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক দাবি।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কথিত নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই নেহা বোরার মন্তব্য সামনে আসে। ২৯ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড এস্টেটিক্স’-এ ডক্টরেট করছেন।

বিজেপি নেতা প্রদীপ ভাণ্ডারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তারিখবিহীন সাক্ষাৎকারের ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করেন। ওই ভিডিওতে নেহা বোরাকে বলতে শোনা যায়, ভারতে বর্তমানে যে ‘জেন জি’ আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, তার সূচনা হয়েছিল প্রতিবেশী বাংলাদেশে। তিনি বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলনের অভিজ্ঞতার প্রশংসা করেন এবং ভারতের তরুণদের প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ জানান।

ভিডিওতে নেহা বলেন, ‘এই দেশে আমরা সর্বত্র যে জেন জি আন্দোলন দেখছি, তা প্রথমে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল। আমাদের পথ দেখানোর জন্য এবং এই দেশের তরুণদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য আপনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন। সেই আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়।

নির্বাচনী অধিকার নিয়ে আন্দোলনের কথা

ভিডিওতে নেহা বোরা ভারতের আন্দোলনকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শুরু হওয়া আন্দোলনও ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকারের দাবিতে। ভারতের তরুণদের বর্তমান আন্দোলনেও একই ধরনের দাবি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

নেহা বলেন, ‘আমরা জানি বাংলাদেশে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ছিল গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকারের জন্য। আজ দেশের তরুণরা যে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে এবং নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেটাও গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকারের আন্দোলন।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে, ভারতের তরুণেরাও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। একটি উন্নত দক্ষিণ এশিয়া ও উন্নত বিশ্বের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণেরা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নেহার বক্তব্যকে যেভাবে ব্যাখ্যা করছে বিজেপি

ভিডিওটি সামনে আসার পর বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি দাবি করেন, নেহা বোরার বক্তব্য ভারতে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার ‘খোলামেলা স্বীকারোক্তি’। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং তাঁর রাজনৈতিক বলয় কেবল সরকারের বিরোধিতা করছে না, বরং বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ভারতে সরকার পরিবর্তন করতে চায়।

ভাণ্ডারি আরও অভিযোগ করেন, নেহা বোরা বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং ভারতে একই ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান। তাঁর দাবি, এর মধ্য দিয়ে রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিজেপির এই মুখপাত্র আরও বলেন, কংগ্রেসের লক্ষ্য রাজনৈতিক বিরোধিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রে কংগ্রেসের রাজনৈতিক বলয় মনোযোগ দিচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্য; প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে এগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

রাহুল গান্ধীর সঙ্গে পদযাত্রায় নেহা

এদিকে, চলতি সপ্তাহে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া ব্লক’-এর নেতাদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে পদযাত্রায় অংশ নেন নেহা বোরা। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বিভিন্ন আন্দোলনকে পৃথক না করে সেগুলোকে একই বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

রাহুল গান্ধী বলেন, ‘সব আন্দোলনই মূলত একটি আন্দোলন। ভারত এগিয়ে চলেছে। আপনি কে বা কোন দলের থেকে এসেছেন, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়; আপনি যদি সংবিধান রক্ষা করেন, তবে আমরা আপনার সঙ্গে আছি, সাহায্য করব ও সুরক্ষা দেব। এটি ভারতের মানুষের প্রতি আমাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।’

বিক্ষোভের পরিচিত মুখ নেহা বোরা

ব্যক্তিগত আলাপে মৃদুভাষী হলেও মাইক্রোফোনের সামনে প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে পরিচিত নেহা বোরা। হিন্দি ও ইংরেজিতে দেওয়া তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি নিয়মিত সাংবিধানিক অধিকার, সরকারি জবাবদিহি এবং বৈষম্যের মতো বিষয় তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করেন।

চলতি বছরের জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আয়োজিত বিক্ষোভে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে পুলিশের পদক্ষেপ ও সরকারের সমালোচনা করে দেওয়া তাঁর বক্তব্য অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে দিল্লির বিভিন্ন বিক্ষোভে তাঁকে নিয়মিত দেখা গেছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময় একাধিকবার আটক হলেও মুক্তি পাওয়ার পর আবারও রাজপথে ফিরে এসেছেন নেহা।

আন্দোলনের চালিকাশক্তি ‘আশা’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা বলেন, শুধু আদর্শ দিয়ে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে না; এর অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ‘আশা’। তাঁর ভাষায়, ‘ভয় সংক্রামক, তবে আশাও সংক্রামক।’

তিনি মনে করেন, মানুষ এখন সাহস পাচ্ছে, কারণ তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে সাহসী হওয়া সম্ভব। তাঁর মতে, বর্তমান বিক্ষোভ এক দিনে তৈরি হয়নি; বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এটি।

নেহা বোরার বক্তব্যকে ঘিরে বিজেপির অভিযোগ এবং বিরোধী শিবিরের আন্দোলন ভারতের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও আলোচনায় এনেছে। তবে বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের বর্তমান বিক্ষোভের তুলনা এবং সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগকে আলাদা করে দেখা জরুরি। নেহার বক্তব্যে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবির কথা রয়েছে, আর সেটিকে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার স্বীকারোক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করছে বিজেপি।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G