ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো থেকে হাড় মজবুত, ব্রকলিতে রয়েছে যত পুষ্টিগুণ
শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে দেখা মিলবে নানা ধরনের তাজা সবজির। এসব সবজির মধ্যে পুষ্টিগুণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ব্রকলি। দেখতে অনেকটা ফুলকপির মতো হলেও এর রং সবুজ। স্বাদ সবার পছন্দ না-ও হতে পারে, তবে শরীর সুস্থ রাখতে ব্রকলির ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এতে থাকা ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, হাড় মজবুত করা এবং শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও ব্রকলি খাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ব্রকলির শুধু ফুলের মতো অংশ নয়, এর ডাঁটাতেও রয়েছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। তাই সঠিকভাবে পরিষ্কার করে রান্না করলে সবজিটির বিভিন্ন অংশ থেকেই পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা থাকতে পারে
ব্রকলি কাটার সময় কিংবা রান্না করার সময় যে বিশেষ ধরনের ঝাঁজালো গন্ধ পাওয়া যায়, তার পেছনে রয়েছে সালফারযুক্ত কিছু যৌগ। এসব যৌগ থেকে তৈরি হতে পারে সালফোরাফেন, যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে। ব্রকলি ছাড়াও ফুলকপি, বাঁধাকপি ও এ ধরনের অন্যান্য সবজিতে একই গোত্রের উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান পাওয়া যায়।
সালফোরাফেন শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে পারে। এর ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক কিছু এনজাইমের কার্যক্রম বাড়তে পারে। পাশাপাশি কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এ উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে ব্রকলির মতো সবজিতে থাকা উপাদান ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনাতেও ব্রকলি খাওয়ার সঙ্গে কিছু ক্যানসারের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা গেছে। ফুসফুস, অন্ত্র ও স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে এমন সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে কয়েকটি গবেষণায়। তবে গবেষণায় কোনো সম্পর্ক পাওয়া মানেই এই নয় যে ব্রকলি সরাসরি ক্যানসার প্রতিরোধ করে।
নিয়মিত ব্রকলি খাওয়া মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের অন্যান্য দিকও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর হতে পারে। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার পেছনে শুধু ব্রকলির অবদান কতটা, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। সুতরাং ব্রকলিকে ক্যানসারের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখতে সহায়ক
হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালির সুস্থতা বজায় রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব অনেক। ব্রকলিতে থাকা পটাশিয়াম, খাদ্যআঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
শরীরে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে পটাশিয়াম ভূমিকা রাখে। এক কাপ কাঁচা, কুচি করা ব্রকলিতে আনুমানিক ২৮৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পাওয়া যায়। তবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
ব্রকলির খাদ্যআঁশ রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
এ সবজিতে রয়েছে ভিটামিন কে, যা স্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক কাপ কাঁচা ব্রকলিতে প্রায় ৯৩ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে থাকতে পারে। তবে যারা রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ সেবন করেন, তাঁদের ভিটামিন কে গ্রহণের পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হাড়ের গঠন ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে
শরীরের ভার বহন, চলাফেরা এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য হাড়ের সুস্থতা অপরিহার্য। হাড় মজবুত রাখতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডির পাশাপাশি ভিটামিন কে এবং ভিটামিন সিরও প্রয়োজন রয়েছে। ব্রকলি এই পুষ্টি উপাদানগুলোর কয়েকটির ভালো উৎস।
ভিটামিন কে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত কিছু প্রোটিনের কার্যক্রমে সহায়তা করে। অন্যদিকে, ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে প্রয়োজন হয়। কোলাজেন হাড়ের কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা হাড়ের গঠন ও নমনীয়তা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
ব্রকলিতে থাকা ভিটামিন সি শরীরের অন্যান্য কাজেও প্রয়োজনীয়। এটি কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
তবে হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু ব্রকলি খেলেই হবে না। বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি।
ব্রকলির পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে রান্নার নিয়ম
ব্রকলি থেকে ভালোভাবে পুষ্টি পেতে রান্নার পদ্ধতির দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত সময় ধরে সেদ্ধ করা বা খুব বেশি তাপে দীর্ঘক্ষণ রান্না করলে এর কিছু পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে।
ব্রকলিতে থাকা মাইরোসিনেজ নামের একটি এনজাইম উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে সালফোরাফেন তৈরিতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় রান্না করলে এই এনজাইমের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই ব্রকলি এমনভাবে রান্না করা ভালো, যাতে তা পুরোপুরি নরম হয়ে যাওয়ার বদলে কিছুটা দৃঢ় থাকে।
অল্প সময় ভাপে সেদ্ধ করা বা কম তেলে অল্প সময় রান্না করা ভালো পদ্ধতি হতে পারে। চাইলে ওভেনেও রান্না করা যায়। অন্যদিকে, পানিতে দীর্ঘ সময় সেদ্ধ করলে ভিটামিন সির মতো পানিতে দ্রবণীয় কিছু পুষ্টি উপাদান রান্নার পানিতে চলে যেতে পারে।
রান্নার আগে ব্রকলি ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া এবং অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চর্বি ব্যবহার না করাও উপকারী অভ্যাস।
শীতের খাদ্যতালিকায় রাখুন নানা রকম সবজি
ব্রকলির পুষ্টিগুণের কারণে শীতের খাদ্যতালিকায় এটি রাখতে পারেন। তবে সুস্থ থাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট সবজির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। ব্রকলির পাশাপাশি ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, পালংশাকসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খেলে শরীর নানা রকম পুষ্টি উপাদান পায়।
সব মিলিয়ে, ব্রকলি একটি পুষ্টিকর সবজি, যা সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে হৃৎপিণ্ড, হাড় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের যত্নে ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাসের সঙ্গে ব্রকলি যুক্ত হলে তা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সহায়ক হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















